সোম. জুন ৫, ২০২৩
Advertisements

খোলাবাজার২৪, রবিবার, ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২ঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ৮ম বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সেতু’ উদ্বোধনে বরিশালের সঙ্গে সারা দেশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগে আর কোন বাধা থাকলো না।

পিরোজপুর জেলার বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের বেকুটিয়ায় কঁচা নদীর উপর নির্মিত এই সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি-কোটি মানুষের আরো একটি স্বপ্ন পুরণ হলো।

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত এবং গভীর সমুদ্রবন্দর পায়রার সঙ্গে দেশের ২য় সমুদ্রবন্দর মংলা ও সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলের সঙ্গে এবং সর্বোপরি পিরোজপুরের সঙ্গে ঢাকার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তবে ভোলা-বরিশালের মধ্যে প্রস্তাবিত সেতু নির্মিত হলে বরিশালের সঙ্গে সারাদেশের শতভাগ সড়ক যোগাযোগের নেটর্ঙ্গে সৃস্টি হবে। সেই সঙ্গে সারা দেশের সাথে ভোলায় উত্তোলনকৃত গ্যাস ও কৃষিজাত দ্রব্য সরবরাহ সহজ হবে, মন্তব্য ব্যবসায়ীদের।

সূত্র মতে, নদী বেস্টিত বরিশাল বিভাগের সঙ্গে সারাদেশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ছিলো না। এমনকি নদী ও খালের কারণে বিভাগের ৬ জেলা ও ৪২টি উপজেলার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিলো না।

১৯৯০ সালে সর্বপ্রথম বরিশাল-ঝালকাঠী সড়কের বাধা কালিজিরা সেতু নির্মাণ করার ফলে এই দুই জেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার সূচনা হয়।

২০০২ সালে বরিশাল-পিরোজপুর সড়কের ঝালকাঠীতে ‘বাংলার সুয়েজখাল’ খ্যাত কৃত্রিম নৌপথ গাবখান চ্যানেলের ওপর ‘পঞ্চম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু’ নির্মাণ করা হলে ঝালকাঠীর রাজাপুর ও কাঠালিয়া উপজেলা, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া ও মঠবাড়িয়া এবং বরগুনার পাথারঘাটা উপজেলার সঙ্গে বরিশালের সরাসরি সড়ক যোগযোগের সূচনা হয়।

ওই রুটের কচা নদীর ওপর বেকুটিয়া পয়েন্টে অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রী ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ পিরোজপুরের এক জনসভায় ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর এই মৈত্রী সেতুর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন তিনি। আজ ৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ৮ম বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সেতু’ উদ্বোধন করেছেন। সেতুটি উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরো একটি নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। সেই সাথে বরিশাল-খুলনা বিভাগের মধ্যে আর ফেরি বাধা থাকলো না।

২০১৭ সালে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার হারতা বাজারের কাছে কচা নদীর উপর সেতু নির্মাণের ফলে বিকল্প পথে বরিশাল থেকে খুলনা বিভাগে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। কিন্তু সেই রুটে দীর্ঘক্ষণ সময় লাগতো।

বরিশালের সাথে মাদারীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ছাড়াও দেশের উত্তরাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার সূচনা হয় ২০০৩ সালের ৮ এপ্রিল। ওই দিন বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের বাবুগঞ্জে সুগন্ধা নদীর ওপর বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (দোয়ারিকা) সেতু ও সন্ধ্যা নদীর ওপর মেজর এম এ জলিল (শিকারপুর) সেতু উদ্বোধন করা হয়।

২০০০ সালে পটুয়াখালী শহরের কাছেই লাউকাঠী নদীর ওপর বরিশাল-পটুয়াখালী সড়কে সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে ওই রুটে আরো ৫টি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

এক সময় বরিশাল থেকে পর্যটনকেন্দ্র সাগরকন্যা কুয়াকাটা রুটে চলাচল করতে ৬টি ফেরি পার হতে হতো। ২০১১ সালে কীর্তনখোলা নদীর ওপর শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু, ২০১৬ সালে পটুয়াখালী-কুয়াকাটা সড়কে কলাপাড়া-নীলগঞ্জ পয়েন্টে আন্ধারমানিক নদের ওপর শেখ কামাল সেতু, হাজীপুর-পুরান মহিপুর পয়েন্টে সোনাতলা নদীর ওপর শেখ জামাল সেতু ও মহিপুর-আলীপুর পয়েন্টে শিববাড়িয়া নদীর ওপর নির্মিত শেখ রাসেল সেতু নির্মাণ করা হয়। ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর ওই রুটে পায়রা সেতুর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এই রুটে ফেরি যুগের অবসান ঘটে।

বর্তমানে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চলছে একসময়ের অবহেলিত জনপদ দক্ষিণাঞ্চলে। যার অন্যতম বাধা ছিলো কচা নদী। ওই নদীতে এই সেতুটি চালু হওয়ায় আগামী কয়েক বছরেই বরিশাল দেশের অন্যতম শিল্পবাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হবে বলে আশা করছেন এখানকার ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদরা।

বরিশাল পটুয়াখালী মিনি বাস মালিক সমিতির সভাপতি কাওছার হোসেন শিপন বলেন, অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু চালু হওয়ায় এই রুটে বাস চলাচলে এখন আর সময় নস্ট হবে না। তাই এই রুটে বাস চলাচল আরো বৃদ্ধি করা হচ্ছে। একসময় ফেরির কারণে যাত্রীসাধারণ ও চালকদের আর ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতো। এখন আর তা লাগছে না।

বরিশালের সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাবেক সভাপতি অ্যাড. এস এম ইকবাল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক নিবাস পদ্মার পশ্চিম পারে। বরিশালের প্রতি তার অনেক আবেগ। এক যুগ আগেও অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলে তিনি দুই হাত ভরে উন্নয়ন দিয়েছেন।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লি. এর সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দক্ষিণাঞ্চল পিছিয়ে থাকার জন্য অবকাঠামোর দুর্বলতাই প্রধানত দায়ী। দক্ষিণাঞ্চলে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের অন্যতম সমস্যা ছিলো ঢাকা ও খুলনার সঙ্গে যোগাযোগের সময় ও দূরত্ব। পায়রা ও অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু চালু হয়েছে। তাই এ অঞ্চলের উন্নয়নে আর কোন বাধা থাকলো না।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসলেই আমাদের বরিশাল বিভাগের উন্নয়ন হয়। তিনি এ অঞ্চলে একে এক ১১টি সেতু নির্মাণ করে সড়ক যোগাযোগে ফেরি যুগেই অবসান ঘটিয়েছেন। সবশেষ অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করেছেন। আগামীতে বরিশালের সঙ্গে ভোলার যোগযোগে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা আছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ হলে বরিশালে ভোলার গ্যাস সরবরাহ সহজ হবে। এতে করে দক্ষিণাঞ্চল হবে আগামীর সিঙ্গাপুর।