সৈয়দ কামরুজ্জামান: বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সংবিধান ও সরকারের কাঠামোগত সংস্কারের দ্বন্দ্ব সাধারণ ভোটারের আস্থাকে নাড়া দিয়েছে। গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগ, তার পরিণতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন—যার নেতৃত্বে রয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনুস—সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক চিত্র বদলে গেছে। নির্বাচন কমিশন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা করলেও রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত নির্বাচন দাবি করে আসছে। এই টানাপোড়েনের মাঝেই সাধারণ ভোটারের মনে বিস্তর সংশয় ও অনিশ্চয়তা জন্ম নিয়েছে—তারা জানতে চায়, ভোট হবে কি, হবে কবে, এবং হয়তো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: “আমাদের ভোটের মূল্য কি রিটেইন করা হবে?”
গত বর্ষে দেশজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভ ও বিক্ষোভ-সংক্রান্ত সহিংসতার পর বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়টি ছিল তখনকার সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো রিপোর্ট করেছে যে ব্যাপক আন্দোলনের পরে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং দেশ ছেড়ে যান; সেনা-নিয়ন্ত্রিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন বিন্যাস গঠন করা হয়। এই ঘটনাটি দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ায় এবং পরবর্তী সরকারের প্রকৃতি—বিশেষত নির্বাচন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত—নিয়ে বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুস। ইউনুস-নেতৃত্বাধীন ওই প্রশাসন দ্রুত কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বাড়ানো, নির্বাচন কমিশনকে শক্ত করা, এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এসব সংস্কারের বাস্তবায়ন ও উদ্দেশ্য নিয়ে দ্বিমত রয়েছে—কেউ এটিকে সময়োপযোগী সংস্কার বলছেন, আবার অনেকে এটিকে ভোট বিলম্বের অজুহাত বলে ব্যাখ্যা করছেন। ইউনুস সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর মিশনকে কেবল অভ্যন্তরীণ সংস্কার নয়, বরং অসময়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ভাঙন মেরামত করাও বলা হচ্ছে।
এক দিকে ড. ইউনুস নিজের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মিশনকে ‘স্বচ্ছতা এবং পুনর্গঠন’ বলছেন; অন্যদিকে কিছু পর্যবেক্ষক আশঙ্কা ব্যক্ত করছেন যে “সংস্কার” শব্দটি যদি দারুণভাবে কেন্দ্রীভূত না হয়, তবে তা সময় খরচ করে রাজনৈতিক শক্তি পুনর্বিন্যাসের কাজে ব্যবহার হতে পারে। Reuters–এর এক রিপোর্টে দেখা যায় যে ইউনুস নিজেও রাজনৈতিক দলগুলোর অমিল ও সংস্কার অগ্রগতির ধীরগতির কারণে পদত্যাগের ভাবনা প্রকাশ করেছেন—এটি নির্দেশ করে যে অন্তর্বর্তী সরকারও চাপের মধ্যে রয়েছে।
সরকারি সূত্র ও জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)–এর ঘোষণায় জানানো হয়েছে যে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার লক্ষ্যে সময়রেখা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি–এ ভোট গ্রহণের রূপরেখা প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের যুক্তি হচ্ছে—নির্বাচনকে সত্যিকারের অংশগ্রহণমুখী ও নিরপেক্ষ করতে বিধিবদ্ধ কাজ, ভোটার তালিকা আপডেট, ভেন্ডর ও পর্যবেক্ষক তালিকা চূড়ান্তকরণ, ভটিং মেশিন (যদি চালু করা হয়) ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা প্রয়োজন। সরকারও বলছে যে গতবছরের বিশৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে আসতে এবং সুশৃঙ্খলভাবে ভোট করাতে সময় জরুরি।
তবে এই ঘোষণাও পর্যবেক্ষকদের উদ্বিগ্ন করেছে—কারণ অনেক বিরোধী দল এবং অংশগ্রহণমূলক গোষ্ঠী মনে করছে যে ইসি–র এই সময়রেখা সংস্কারের নাম করে নির্বাচন বিলম্বিত করার সুযোগ দেবে। ফলে, ইসি–র ঘোষিত সময়সূচি সত্ত্বেও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো—দলের পরিধি ও আদর্শ ভেদে—সম্মিলিতভাবে দ্রুত নির্বাচন চাচ্ছে, এবং তাদের যুক্তি রয়েছে:
অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা: দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ব্যবসায়, কর্মসংস্থান ও সেবাখাতে বড়ঘাটতি সৃষ্টি করছে; দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত এবং দায়িত্বশীল সরকারের পুনরায় গঠন দেশকে স্থিতিশীল করবে।
আগামীকালীন গণতান্ত্রিক বিধি: দলের নেতারা বলছেন, জনগণের ইচ্ছাকে আটকে রাখলে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে এবং রাজনীতিকে অনির্দিষ্টভাবে সংকুচিত করে।
অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সীমা: বিরোধীরা দাবি করে যে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের মূল কাজ হলো দ্রুত নির্বাচন সুনিশ্চিত করা; “সংস্কারের” নামে দীর্ঘায়িত থাকার ফলে দায়িত্বহীনতা বাড়ে এবং রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
বিএনপি, ইসলামী দল, বামজোট ও অন্যান্য কয়েকটি গোষ্ঠী সংবাদমাধ্যমে বারবার তাদের দ্রুত নির্বাচনের দাবি তুলেছে—তারা বলছে, দেশের ভবিষ্যৎ ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে নির্বাচন আর বিলম্ব করা যাবেনা। এটিই সামাজিক চাপের এক বড় উৎস।
আমরা দেশের বেশ কয়েকটি জেলা, শহর ও গ্রাম পর্যায়ে ভোটারদের সাথে কথা বলেছি। পাওয়া প্রতিক্রিয়া কয়েকটি মূখ্য বিষয়ে কেন্দ্রীভূত:
ভোটের বৈধতা ও গণনা-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা: বহু পুরনো অভিজ্ঞতা—ভোট কাগজকাটা, কেন্দ্র দখল, গণনা-বিরোধ—জনপ্রিয় আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মানুষ জানতে চায়: যদি নির্বাচন হয়, তাহলে কি গণনা ও ফলপ্রকাশ নিরপেক্ষ হবে?
নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ: প্রত্যেকে চান শান্তিতে ভোট দিতে; কিন্তু সংঘাত-ঝুঁকি দেখলে ভোট কেন্দ্রে যাওয়া থেকে কেউ বিরত থাকতে পারেন। বিশেষত নারী ও দুর্বল গোষ্ঠীর কাছে এটি বড় সমস্যা।
সংস্কার বনাম সময়ক্ষেপণ: অনেকে বলেন—“সংস্কার দরকার, কিন্তু যদি ‘সংস্কার’ শুধু সময় নষ্টের কৌশল হয়, তাহলে তা অনিষ্টকর।” তারা দ্রুত নির্বাচন চায় যাতে প্রশাসনিক মেয়াদকারিতা আর নেতাদের বিরোধপূর্ণ ক্ষমতা-সংগঠন শেষ হয়।
একটি মধ্যবয়স্ক শিক্ষকের মন্তব্য ছিল—“আমরা জানি যে দেশকে রিফর্ম করা দরকার। কিন্তু সেই রিফর্ম কি জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব? ভোটের মেয়াদ বাড়ালে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” এই মতামত ব্যাপকভাবে দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র সময়সীমা নির্ধারণ নয়—এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতা ও সকল স্টেকহোল্ডারের অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন: সংবিধান ও কাঠামোগত সংস্কার দুটোই প্রয়োজন; কিন্তু একতরফাভাবে এগোলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত অন্তর্ভুক্ত করে একটি রূপায়ণ করা না গেলে নির্বাচনের ফলাফল বৈধতা পাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা (যেমন রইটারস, আল জাজীরা, ফ্রান্স-২৪) ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া মনোনিবেশ করে দেখছে; তারা বলছে—স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দেশই দ্রুত পুনর্গঠিত হবে।
অন্যদিকে, ড. ইউনুস নিজেও বারবার সতর্ক করেছেন যে যদি রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের উপর একমত না হয়, তবে তিনি পদত্যাগের কথা বিবেচনা করতে পারেন—যা আবারও দেশের রাজনৈতিক অবস্থাকে অনিশ্চিত করে তোলে। Reuters–এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে সাংবাদিকদের উদ্ধৃতি আছে যে ইউনুস ‘পদানত্যাগের ভাবনা’ প্রকাশ করেছেন কারণ রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতা করতে ব্যর্থ।
এই টানাপোড়েনের ফলে কয়েকটি ঝুঁকি এখন চোখে পড়ে:
আস্থা-ভঙ্গ: ভোটারের আস্থা হঠাৎ করে ভেঙে গেলে নির্বাচনী অংশগ্রহণ কমে যাবে এবং নির্বাচন রাজনৈতিক অনুমোদনহীন হয়ে পড়বে।
দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা: নির্বাচন বিলম্ব এবং রাজনৈতিক ফাটলে নিয়মিত জনগণ হতাশ হয়ে সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
আন্তর্জাতিক চাপে দেশপ্রভাবিত হবে: অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে যদি নির্বাচন-প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য না হয়।
কিন্তু সুযোগ আছে—যদি প্রকৃতিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ধারায় ভোট অনুষ্টিত করা যায় এবং ব্যপক রাজনৈতিক সমঝোতা গড়ে ওঠে, তাহলে সংবিধান ও সংস্কার দুটোকে সমন্বয় করে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক পটভূমি নির্মাণ করা সম্ভব।
বাংলাদেশ এই মুহূর্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়েছে—শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে গেছে, ড. ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কাঠামোগত সংস্কার ঘোষণা করেছে, নির্বাচন কমিশন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভোটের রোডম্যাপ বলেছে, অথচ রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত নির্বাচনের দাবি করছে—এত দ্বন্দ্বের মাঝে সাধারণ ভোটার অনিশ্চয়তার সাগরে। তাদের প্রশ্ন সোজা: কবে ভোট হবে? তারা কি শান্তিতে ভোট দিতে পারবে? তাদের ভোট কি মান্য করা হবে? এই প্রশ্নগুলোর জবাব পাবার জন্য প্রয়োজন—উন্মুক্ত আলোচনা, রাজনৈতিক দলগুলোর পারে- জোরালো ঐক্যমত্য, এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা। না হলে জনগণের আস্থা ফেরানো অসম্ভব হবে।