Thursday , August 8 2019
ব্রেকিং নিউজ :

Home / ফিচার / বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার-আবু আহমেদ

বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার-আবু আহমেদ

একবারও আমরা শান্ত মেজাজে চিন্তা করেছি যে আমাদের অর্থ পাচার হয়ে কোথায় যাচ্ছে এবং আমাদের দেশ থেকে কেনই বা অর্থ পাচার হচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে সে চিন্তা থেকেও আমাদের জন্য বড় চিন্তার বিষয় হওয়া উচিত ছিল কেন আমাদের দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে। এই কেনকে আমরা অ্যাড্রেস করতে কখনো চিন্তা করনি। কই, অন্য অনেক দেশ তো বলছে না, তাদের দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে। বরং বিশ্বে অনেক দেশ আছে, যারা আমাদের মতো দেশ থেকে অর্থ পাচার হলে খুশি হয়। এর কারণ হলো, আমাদের মতো দেশ থেকে যে অর্থ পাচার হয় তার সুবিধাভোগী হলো তারা। তারা মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটা গ্লোবাল আইন তৈরি করেছে; কিন্তু ব্যাপক অর্থে এক দেশের অর্থ অন্য দেশে বেআইনিভাবে প্রবাহের ক্ষেত্রে কোনো আইন তৈরি করেনি।

কোনো শক্তিমান দেশে তো দরিদ্র দেশগুলো থেকে যে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি ডলারের অর্থ পাচার হচ্ছে, সে ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে একটা অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করল না।

সত্য হলো, যত দিন যাচ্ছে এক ধরনের যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব বজায় থাকবে এবং যত দিন ছোট অর্থনীতিগুলোকে বিচ্ছিন্ন রেখে সেগুলোকে নানা কৌশলে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হবে, এত দিনই এসব অর্থনীতি থেকে অর্থ বেআইনিভাবে হোক আর আইনিভাবে হোক, উন্নত এবং স্থিতিশীল অর্থনীতিগুলোতে প্রবাহিত হবে। শত নিরোধক আইন করেও কোনো দেশ অর্থকে তার সীমানার মধ্যে ধরে রাখতে পারেনি। অর্থের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে কোনো পাসপোর্ট-ভিসা লাগে না। অর্থ স্থানান্তরিত হয় একটা হুকুমে, স্রেফ অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার। বেচাকেনার নামেই বেশি অর্থ পাচার হয়। এবং আজতক বেচাকেনার কাগজপত্র পরীক্ষা করে কোনো দেশেরই উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ বলতে পারেনি যে এ ক্ষেত্রে মিসম্যাচ হয়েছে বা এই বেচাকেনায় নিজ দেশ থেকে বেশি অর্থকে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থপ্রবাহকে বাধা দিলেই কিছু লোক থাকবে, যারা কথিত আইন ভঙ্গ করে তাদের অর্থ বাইরে নিয়ে যাবে।

অর্থকে দেশে রাখার সর্বোত্তম উপায় হলো অর্থনীতিকে খুলে দেওয়া। অর্থনীতিকে এমন করা যে এখানে কেউ অবাধে অর্থ আনতেও পারবে আবার নিতেও পারবে। এমন যদি হয়, তাহলে অর্থের বা মুনাফার ভিত্তিতে অর্থ আসবে এবং যাবে। কোন দেশগুলো থেকে অর্থ পাচার হয়? ছোট এবং বিচ্ছিন্ন দেশগুলো থেকে। কই, কেউ তো বলছে না যে যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য থেকে বছরে এত শত বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার হচ্ছে। তাহলে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান-নাইজেরিয়া, মিসর, আফগানিস্তান থেকে কেন এত অর্থ পাচার হচ্ছে। কোন দেশ থেকে কত অর্থ পাচার হবে, তা নির্ভর করে সে দেশের আয়ের ওপর, ওই দেশগুলোয় সম্পদের কেন্দ্রীভূততার ওপর, ওই দেশগুলোতে সামাজিক সুখ ও শান্তির ওপর, ওই দেশগুলোর অর্থসংক্রান্ত আইন-কানুনের ওপর, ওই দেশগুলোতে বিনিয়োগের সুযোগগুলোর প্রাপ্যতার ওপর। অর্থ দেশীয় মুদ্রায় পাচার হয় না। অর্থ পাচার হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতাও অর্থপাচারের ক্ষেত্রে একটা সাহায্যকারী ফ্যাক্টর। বৈদেশিক মুদ্রা আইনিভাবে দেশের বাইরে নিতে না পারলে ধনী লোকেরা তখন বিভিন্ন কথিত বেআইনি পথ খোঁজে, কিভাবে তার অর্থ বাইরে নেওয়া যায়। কিন্তু নিরোধক আইন করে কোনো দেশই তার আয় দেশের মধ্যে রাখতে পারেনি। বরং ওই সব দেশই আয়কে দেশের মধ্যে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যারা বৈদেশিক মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয়কে সহজ করে আয়কে আইনিভাবে দেশে আসতে এবং যেতে সহায়তা করেছে।

আমাদের অনেকের মধ্যে একটা ভুল চিন্তা আছে, কঠিনকে কঠিন করে অর্থপাচার বন্ধ করা যাবে। বরং অবস্থানটা হওয়া উচিত ছিল উল্টো। আরো একটা ভুল ধারণা কাজ করছে, বৈদেশিক মুদ্রা সহজে পেতে দিলে দেশ থেকে সব বৈদেশিক মুদ্রাই চলে যাবে। এটা একটা ডাহা ভুল ধারণা। অন্য অনেক দেশ জিজ্ঞেসই করে না আপনি কত পরিমাণ ডলার-পাউন্ড বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন। আসলে যেটা দেখা দরকার সেটা হলো, অর্থটা আইনিভাবে অর্জিত হয়েছে কি না এবং সেই অর্জিত অর্থের বিপরীতে ট্যাক্স দেওয়া হয়েছে কি না। মানুষের বৈধভাবে অর্জিত অর্থ বাইরে নিতে কোনো বাধা থাকা উচিত না। আমরা বৈধভাবে অর্জিত অর্থ মুক্তভাবে দেশের বাইরে নিতে বাধা দিচ্ছি বলে অনেকে নিজেদের সেই আয় আমাদের রচিত আইনকে ভঙ্গ করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আর যেহেতু আইন ভঙ্গ হচ্ছে, সেই হেতু আমরা বেআইনি অর্থ স্থানান্তরকে বলছি পাচার। তাহলে দোষটাকে খুঁজতে হবে আমাদের নিরোধক আইনের মধ্যে যে আইন পাচারকে ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সত্য হলো, আইন করে কোনো দেশই তাদের নাগরিকদের অর্থ দেশের সীমানার মধ্যে রাখতে পারেনি। এমনকি এই আইন ভঙ্গকারীদের শাস্তি দিয়েও দেশের অর্থ দেশে রাখা যাবে না।

অর্থপাচারের গতি একমুখো। এর গন্তব্য বিচ্ছিন্ন এবং অস্থিতিশীল অর্থনীতিগুলো থেকে উন্নত-স্থিতিশীল অর্থনীতিগুলোর দিকে। বিশ্বে এক ধরনের অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং বজায় রাখলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় সেটা উন্নত দেশগুলোর পক্ষে যায়। অর্থপাচার ইউরোপ-উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর জন্য কোনো সমস্যা নয়। অর্থপাচার সমস্যা হলো আফ্রিকা ও এশিয়ার এবং লাতিন আমেরিকার ছোট দেশগুলোর জন্য, যেসব দেশ অনুন্নত এবং যেসব দেশ যেকোনো কারণেই হোক এক ধরনের সামাজিক অস্থিরতায় ভুগছে। আরো একটা বিষয় লক্ষণীয় তা হলো, যেসব অর্থনীতি জোটভুক্ত বা ইকোনমিক ইউনিয়ন গড়ে তুলতে পেরেছে, সেসব দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে না। যেমন আসিয়ান  (ASEAN) দেশগুলো থেকে। হলেও খুবই কম পাচার হচ্ছে। একসময়ে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া-থাইল্যান্ড থেকেও অর্থ পাচার হতো, এখন হয় না। কারণ এসব দেশ উন্নয়নের পথে অনেক এগিয়ে গেছে এবং এরা একটা বড় অর্থনৈতিক জোট গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। এই জোটভুক্ত দেশগুলোতে তারা পণ্যের প্রবাহ যেমন অবাধ করছে, তেমনি অর্থের প্রবাহও অবাধ করেছে। সেই সঙ্গে জোটভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকরাও ভিসামুক্ত অবস্থায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে পারে। বাংলাদেশ কি সেই অবস্থায় যেতে চেষ্টা করেছে?

ভিয়েতনাম-থাইল্যান্ড কয়েক ডজন Free Trade Agreements (FTA) সই করেছে  ASEAN জোটের বাইরে গিয়েও। বাংলাদেশ কি একটাও  FTA সই করেছে? বাংলাদেশ শুধু গবেষণা ও চিন্তা করেছে এ নিয়ে; কিন্তু বাস্তবে কিছুই করেনি। যেসব দেশ বিশ্বের সঙ্গে (globally) সংযুক্ত হতে পারেনি, ওই সব দেশ থেকেই অর্থ পাচার বেশি ঘটছে। আমাদের অবস্থা হলো, আমাদের দেশে কেউ আসতে চায় না বা আমরাও আসতে উৎসাহ দিচ্ছি না। ফলে আমরা গ্লোবাল উৎস থেকে বিনিয়োগও কম পাচ্ছি। থাইল্যান্ডে প্রতিবছর ৪০ মিলিয়ন বা চার কোটি লোক শুধু পর্যটক হিসেবে প্রবেশ করে। সেই থাইল্যান্ড শুধু পর্যটনশিল্প থেকে বছরে আয় করে ৫৫ বিলিয়ন ডলার। আর এ ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন কী? যেসব দেশ গ্লোবাল কানেকটেড এবং যেসব দেশ বিনিয়োগের জন্য তার অর্থনীতিকে খুলে দিয়েছে, সেসব দেশ থেকে অর্থ পাচার অনেক কম হয়। কই, থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ার জন্য তো এটা একটা বড় সমস্যা নয়।

দেশের লোকদের বিশ্বাস করতে হবে এবং তার অর্থের জন্য যথেষ্ট চাহিদা এই অর্থনীতিতেই আছে এবং তার অর্থ সম্পূর্ণ নিরাপদ। সে যখন খুশি তার অর্থ মুক্তভাবে অন্য দেশে স্থানান্তর করতে পারবে। আমরা গ্লোবাল কানেকটিভিটি সূচকে তলানিতে আছি। শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে আমরা ৩২ থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করছি। সেটা আর কত দিন। ভারত শুধু স্বর্ণালংকার (Jewellary) রপ্তানি করে বছরে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের। আমাদের একটা অর্থনীতি রয়েছে বটে। তবে সেটা নিয়ে এখনো আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশেও একটা রপ্তানিমুখী টেকসই জুয়েলারি শিল্প গড়ে উঠতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। আমাদের ছোট আকারের হলেও একটা কমোডিটি মার্কেট আছে, সেখানে ধনীরাও বিনিয়োগ করতে পারবে। বিনিয়োগ সুযোগের অভাবও অর্থপাচারের অন্যতম কারণ।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email

About kholabazar 24