খােলা বাজার২৪।।বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭: রোহিঙ্গা নাগরিক হত্যা-নির্যাতন ও বিতাড়নের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রবল নিন্দা-প্রতিবাদের মুখে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে মিয়ানমার। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে নিউ ইয়র্কে আসিয়ান দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বিশেষ সভায় রাখাইন রাজ্যের সংকটের বিষয়টি আলোচিত হবে বলে মিয়ানমার টাইমসকে জানিয়েছেন দেশটির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে যৌথ ঘোষণার খসড়া নিয়ে ফিলিপাইন ও মিয়ানমারের কর্মকর্তারা কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
গত কয়েক সপ্তাহে সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার সফরকালে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠক করে রাখাইন সমস্যা সমাধানে আলাপ করেছেন। নিউ ইয়র্কে আসিয়ান মন্ত্রীদের বৈঠকে মিয়ানমারের পক্ষে এ দুই সদস্য দেশের সমর্থন পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন মিয়ানমারের ওই কর্মকর্তা। আসিয়ান জোটভুক্ত দেশগুলো সদস্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলায় না, ফলে এ ক্ষেত্রে তাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও তাঁর ধারণা।
২৫ আগস্ট পুলিশ পোস্টে সন্ত্রাসী হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ১২ জন নিহত হওয়ার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের’ নামে উত্তর রাখাইনের রোহিঙ্গা মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে নির্বিচার হত্যা ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে, যাকে জাতিসংঘ ‘জাতিগত নিধনের নিখুঁত দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেছে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় রাখাইন সন্ত্রাসীরা। প্রাণ বাঁচাতে হেঁটে পাহাড়-নদী পার হয়ে রোহিঙ্গা নাগরিকরা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তাদের সংখ্যা এরই মধ্যে চার লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যাই বেশি।
রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যাপকতা বিশ্বের ভয়াবহতম শরণার্থী পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক একটি সংস্থা।
নিউ ইয়র্কে গতকাল থেকে শুরু হওয়া সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের নির্ধারিত আলোচ্যসূচিতে না থাকলেও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করবে বাংলাদেশ। তুরস্ক ও ইরানও এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বলে এরই মধ্যে জানিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বিষয়টি নিয়ে আগেই সোচ্চার হয়েছেন। সর্বশেষ বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গায় সেনাবাহিনীর নির্যাতন বন্ধে অং সান সু চির সামনে শেষ একটি সুযোগ আছে, তিনি এখনই তা কাজে না লাগালে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল সু চির। রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নিন্দা-প্রতিবাদের মধ্যে সেখানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাঁর বদলে জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন দেশটির উপরাষ্ট্রপতি।
২৫ আগস্টের পর থেকে শুরু হওয়া বিভীষিকা এখনো চলছে। মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গতকাল বাংলাদেশের সীমানায় এসেছেন নূর হাওয়া। উত্তর রাখাইনের মংডু শহরের কাছের একটি গ্রামে তাঁর বাড়ি ছিল। গত শুক্রবার চোখের সামনেই নিজের গ্রামকে পুড়তে দেখেছেন তিনি। তবে সেখানে সব কিছুই স্বাভাবিক—এ চিত্রই দেখাতে সচেষ্ট দেশটির প্রশাসন। রা নেই গণমাধ্যমেও। রবিবার সেই মংডুসহ উত্তর রাখাইনের তিনটি শহরে রাস্তা, সড়ক ও বিদ্যুৎ সরবরাহের উন্নতি দেখতে গেছেন মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় এক মন্ত্রী, সঙ্গে ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রীও। সেই খবর ছাপা হয়েছে সরকারি পত্রিকা গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমারে।
গত ২৪ আগস্ট কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদ রাখাইন সংকট সমাধানে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সু চি পরিষদের সুপারিশ গ্রহণ করে সেগুলো বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু এর এক দিন পরই (২৫ আগস্ট) রাখাইন রাজ্যে বেশ কয়টি পুলিশ পোস্টে হামলার ঘটনা ঘটে, যার পেছনে আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিরোধীদের ইন্ধন থাকতে পারে বলে মনে করছেন মিয়ানমারে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রিসিলা ক্ল্যাপ। ফ্রান্সের একটি টিভি চ্যানেলকে তিনি বলেছেন, কফি আনানের পরামর্শ যখন তিনি গ্রহণ করলেন, বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেন, তখনই ঘটল হামলার ঘটনা। বাইরে থাকা সন্ত্রাসীরা ঘটিয়েছে এটি। এ থেকেই বর্তমান সংকট শুরু।
আনান কমিশনের সুপারিশমালায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ দেখানো হয়েছে, বর্তমান সংকট শুরুর পরও সু চি সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করছেন বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক এক মার্কিন কূটনীতিক, যিনি এখন ইউএস ইনস্টিটিউট ফর পিসের উপদেষ্টা। ‘তিনি (সু চি) তো সব রোহিঙ্গাকে সন্ত্রাসী বলেননি। তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক যারা অস্ত্র হাতে স্বগোত্রের মানুষ, বৌদ্ধ, হিন্দুদের আক্রমণ করছে, তাদের কথা বলেছেন। ’
বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মধ্যে সাবেক মার্কিন এ কূটনীতিকের মন্তব্যকে সু চির জন্য স্বস্তিদায়ক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যমে। তবে বৈশ্বিক সমালোচনার মূল লক্ষ্য সু চি হলেও দেশটির ক্ষমতার কলকাঠি যে সেনাবাহিনীর হাতে সে দেশটির কিছু পত্র-পত্রিকাও সে সত্য আকারে-ইঙ্গিতে হলেও স্বীকার করে।
ফ্রন্টিয়ার সাময়িকীতে এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবেই রাখাইন সমস্যা প্রকট হয়েছে। উত্তর রাখাইন নিয়ে সেনাবাহিনী ও সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি সরকার আলাদা পথে হাঁটছে। সেনাবাহিনী চায় ১৯৮২ সালের নাগরিক আইনের আওতায় কঠোর দমননীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। দেশটির জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কাউন্সিলে ১১ সদস্যের মধ্যে ছয়জন রয়েছেন সেনাবাহিনীর। তাঁদের দাবি, উত্তর রাখাইনে সামরিক শাসন জারি হোক। সেনা সমর্থিত প্রায় দুই ডজন রাজনৈতিক দল আনান কমিশনের সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এর অনুসরণে নাগরিক আইন সংস্কার হলে দেশের ঐক্য বিঘ্নিত হবে।
অন্যদিকে সু চির এনএলডি সরকার চায় আনান কমিশনের সুপারিশের আলোকে সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজতে। আনান কমিশনের সুপারিশে নাগরিক আইনের পরিবর্তনের পাশাপাশি রোহিঙ্গা নাগরিকদের চলাচলের স্বাধীনতা ও তাদের উন্নয়নে অর্থনৈতিক কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে। সু চির সরকার এসব দাবির প্রতি সংবেদনশীল থাকলেও সেনাবাহিনী বিদ্যমান নাগরিক আইন কেন আঁকড়ে রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে ওই নিবন্ধে।
সেনাবাহিনীর প্রভাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পক্ষে মতামত দুর্লভ। কেবল কারেন জাতিগোষ্ঠীর একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে রাখাইনে নৃশংসতা বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। সেনাবাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবিও রয়েছে তাদের। এর আগে সেনাবাহিনীর কঠোর অভিযানে লক্ষাধিক কারেন থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে এখন শান্তি স্থাপিত হয়েছে।
মিয়ানমারের ইরাবতী সাময়িকীতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে দেশটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিষয়ক গবেষক কো মং সু বলেন, এনএলডি সরকার এক বছর ধরে চেষ্টা করছে সমস্যা সমাধানের। কিন্তু তাদের ক্ষমতা নেওয়ার আগেই সমস্যা জটিল হয়ে পড়েছিল। এখন অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনগুলোর উচিত সু চির এনএলডি সরকারকে রাখাইন সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করা।
সু চির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, যা ২০১৫ সালের পর থেকে ওবামা প্রশাসন উঠিয়ে নিয়েছে। কিন্তু নতুন করে রোহিঙ্গা সমস্যা প্রকট হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়ানো কঠিন হবে। মার্কিন উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাট্রিক মারফি চলতি সপ্তাহেই মিয়ানমার আসছেন। তিনি রাখাইন রাজ্যের রাজধানীতে গিয়ে রাজ্যের কর্মকর্তা, রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তবে উপদ্রুত উত্তর রাখাইনে যাচ্ছেন না তিনি।
গতকাল থেকে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনসহ বিভিন্ন বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে সরব বিশ্বনেতারা। আর এ সংকট নিয়ে আজই স্বদেশে দীর্ঘ নীরবতা ভাঙবেন অং সান সু চি। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ এ মানবিক বিপর্যয়ের সমাধানে সু চি কী বলেন, বিশ্ব যখন তা জানার প্রতীক্ষায় থাকবে, মিয়ানমার তখন সমর্থনের আশায় তাকিয়ে থাকবে আসিয়ান নেতাদের দিকে।