Wednesday , October 16 2019
ব্রেকিং নিউজ :

Home / ফিচার / দুর্নীতি ও মাদক নির্মূলে মানসিকতার পরিবর্তন দরকারঃ ড. মো. নাছিম আখতার

দুর্নীতি ও মাদক নির্মূলে মানসিকতার পরিবর্তন দরকারঃ ড. মো. নাছিম আখতার

খােলাবাজার ২৪, মঙ্গলবার ১৮ জুন ২০১৯ঃ মানুষের মনই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। চিন্তার প্রবাহ যদি ইতিবাচক হয়, সমাজ হয় সুন্দর ও সুশৃঙ্খল। যদি সেটি নেতিবাচক হয়, তাহলে সমাজ হয় বিশৃঙ্খল। সমাজে বাসা বাঁধে দুরারোগ্য ব্যাধি দুর্নীতি ও মাদক। তাই দুর্নীতি ও মাদক নির্মূলে দরকার সবার মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। তবে এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটাতে দরকার যৌক্তিক পদক্ষেপ।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সবার আগে ব্যাখ্যা দরকার ‘সম্পদ (Property)’ ও ‘দায় অথবা ভার (Liability)’-এর মধ্যে পার্থক্য। অর্থনীতির ভাষায় একটি গাড়ি যখন কোনো পরিবারের রুজিরোজগারের উৎস তখন সেটি হচ্ছে সম্পদ। কারণ ওই গাড়ির আয় দিয়ে চলছে ব্যক্তির সংসার, সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটির মেরামতের জন্য খরচও আসছে ওই গাড়ির আয় থেকেই। আর কোনো ব্যক্তি যখন তার আরাম-আয়েশের জন্য প্রাইভেট কার ব্যবহার করে তখন কারটি থেকে আয় তো আসেই না, বরং প্রতিবছর তেল, ড্রাইভার ও নিবন্ধন বাবদ ওই ব্যক্তির আয়ের একটি বড় অংশ খরচ হয়ে যায়। তখন এই গাড়িকে কিন্তু সম্পদ হিসেবে দেখা হবে না, দেখতে হবে দায় বা ভার হিসেবে। দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ পুঞ্জীভূত করে ওই সম্পদ রক্ষায় যদি লাখ লাখ টাকা ঘুষ গুনতে হয়, তাহলে সেটি আর সম্পদ থাকে না, দায় বা ব্যক্তিগত বোঝায় পরিণত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রধান বনরক্ষক ঘুষের টাকা রাখার জায়গা না পেয়ে বালিশের মধ্যে, তোশকের নিচে রেখেছিলেন। তাঁর কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। প্রধান বনরক্ষকের এই টাকাকে আমি সম্পদ না বলে বোঝা হিসেবে চিহ্নিত করছি। অর্জিত সম্পদ রক্ষায় যদি সর্বদা ভয় ও পেরেশানির মধ্যে থাকতে হয়, মানসিক চাপের কারণে হৃদরোগ থেকে শুরু করে নানা রকম রাজরোগ শরীরে বাসা বাঁধে, তাহলে সেই সম্পদ অর্জনের চেয়ে সৎ ও বৈধ পথে যা আসে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকার জীবন দর্শন গড়ে তোলা সবার জন্যই মঙ্গলজনক বলে আমি মনে করি।

সংসারে যদি সাধ আর সাধ্যের সমন্বয় না থাকে, তাহলে সংসারে শুরু হয় টানাপড়েন, ধার-দেনা। সংসার হয় অশান্তির অনল, তেমনি দেশ ও জনগণের সম্পদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধির সঙ্গে যদি জনগণের বিলাসী খরচের সামঞ্জস্য না থাকে, তাহলে সেখানে দুর্নীতি হবে, এটি হলফ করে বলা যায়। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইংল্যান্ডের জনগণের প্রত্যেকের বার্ষিক আয় যথাক্রমে ৬৫, ৫৭, ৪৮, ৪২ হাজার ডলার। বাংলাদেশের টাকায় রূপান্তর করলে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৫২ লাখ, ৪৬ লাখ, ৩৮ লাখ, ৩৪ লাখ টাকা (প্রায়)। সেখানে আমাদের আয়ের পরিমাণ বছরে মাথাপিছু এক হাজার ৭০০ ডলার বা এক লাখ ৩৬ হাজার টাকা। উপরোল্লিখিত উন্নত এই চারটি দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন আয়ের দেশের চেয়ে আমরা মাথাপিছু আয়ের দিক দিয়ে প্রায় ২৫ গুণ পিছিয়ে আছি। কিন্তু ঈদ বা কোনো পালাপার্বণে যখন কেনাকাটা করা হয় তখন দেখি ৮০ হাজার টাকার পাঞ্জাবি, পাঁচ লাখ টাকার শাড়ি, ১৪ লাখ টাকার কোরবানির গরু প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বিক্রি হচ্ছে। এমন ভোগসর্বস্ব মনোভাব আমাদের সবারই পরিহার করা উচিত। তা না হলে দুর্নীতি কমবে না। আমার বিলাসী ব্যয়ের মাত্রা কখনোই দেশের আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হওয়া উচিত নয়। হলে অবশ্যই আমাকে চুরি করতে হবে, যার আধুনিক নাম দুর্নীতি। ঈদের ছুটিতে নিজ শহরে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি প্রাইভেট পলিটেকনিকে শিক্ষকদের বেতন দেখলাম প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা। আর প্রিন্সিপালের বেতন ছয় হাজার টাকা। দেশের প্রান্তিক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যখন জীবনযুদ্ধে এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি তখন পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে অগ্নিমূল্যের দ্রব্যসামগ্রী ক্রয়ের খবর নিঃসন্দেহে খেটে খাওয়া বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মনে দুঃখের উদ্রেক করে। ভোগসর্বস্ব কতিপয় মানুষের নিজেকে জাহির করার সংবাদ প্রদান থেকে বিরত থাকাই শ্রেয় বলে আমি মনে করি। আর যদি খবর প্রচার করতেই হয়, তাহলে তাদের অর্থের উেসর খবরও প্রকাশ করা উচিত। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা অতীব জরুরি। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথ যদি বৈধ না হয়ে অবৈধ হয়, তাহলে সেটি দেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। অবৈধ পন্থা অবলম্বনে যদি কোনো শাস্তির ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে মানুষ বিলাসবহুল জীবনযাপনের নেশায় জাতির সর্বনাশ ডেকে আনবে, এটিই স্বাভাবিক। ২৫ মে ২০১৯ তারিখে একটি জাতীয় দৈনিকের খবরের শিরোনাম ‘প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস’। খবরে প্রকাশ, ঘটনায় জড়িত ২১ জনের মধ্যে দুজন সরকারি ব্যাংকে ম্যানেজার পদে চাকরিরত। আশ্চর্য হই এই ভেবে যে ১৬ কোটি লোকের দেশে এমন সুন্দর সম্মানজনক চাকরি থাকা সত্ত্বেও আরো সম্পদের আশায় মানুষ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। লোভ ও ভোগের বাইরেও যে একটি সুন্দর জীবনযাপন সম্ভব, তা সবাইকে বোঝানো জরুরি।

যেকোনো ধর্মের আলোকে বলা হয়, মন্দ কাজ করা থেকে পাপের উৎপত্তি, আর ভালো কাজ করা থেকে পুণ্যের উৎপত্তি। বিজ্ঞান বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছে পজিটিভ এনার্জি ও নেগেটিভ এনার্জির মাধ্যমে। প্রত্যেক মানুষের দেহের চারপাশে চুম্বক বা বৈদ্যুতিক আবেশের মতো রয়েছে শক্তির বলয়। এই শক্তি সমাজের পারিপার্শ্বিকতা থেকে একাধারে যেমন নেগেটিভ এনার্জি গ্রহণ করতে পারে, তেমনি পারে পজিটিভ এনার্জি গ্রহণ করতে। মানুষ যদি তার চিন্তা ও কর্মে নিরন্তর নেগেটিভ এনার্জি গ্রহণ করে, তাহলে তার আত্মা হয় বিক্ষিপ্ত। ব্যক্তিজীবনে সে সুখ খুঁজে পায় না, বরং পাপের ভারে সে মাদক বা অবৈধ সমাজবিরোধী আনন্দের দিকে ধাবিত হয়। সুতরাং জীবনকে সুন্দর ও সার্থক করার জন্য সর্বদা সৎ চিন্তা ও বৈধ কর্ম করা আবশ্যক। তা ছাড়া দুর্নীতির বিচারে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে থাকতে হবে দুর্নীতিমুক্ত।

দুর্নীতির সঙ্গে মাদকের রয়েছে নিবিড় যোগসূত্র। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের ব্যয় সুপথে হয় না। এই অর্থ ব্যয় করতে মানুষ সমাজের পঙ্কিল পথে পা বাড়ায়। অসৎ কর্মের মাধ্যমে অর্জিত নেগেটিভ এনার্জির ফলে মন ও আত্মা সব সময় বিক্ষিপ্ত থাকে। আত্মাকে শান্ত করতেই দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ মাদক গ্রহণের দিকে আকৃষ্ট হয়। কথায় আছে, ‘বিষেই বিষ ক্ষয়।’ তাই দুর্নীতি বন্ধ হলে মাদকের ব্যবহারও হ্রাস পাবে বলে আমার বিশ্বাস।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনের এক বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘দুর্নীতি আমরা করব না এবং কাউকে করতেও দেব না।’ আসুন, আমরা সবাই তাঁর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করি। উন্নত দেশ গড়তে ১৭ কোটি মানুষের সমন্বয়ে গড়ে তুলি দুর্নীতিবিরোধী বর্ম।

লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

Print Friendly, PDF & Email

About kholabazar 24