Tue. Jun 22nd, 2021

খােলাবাজার২৪, শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১ঃ নড়াইলে প্রায় দুই হাজার গ্রাহকের তিন মাসের বিদ্যুৎ বিলের পাঁচ লক্ষাধিক টাকা আর জামানতের দুই কোটি টাকা হাতিয়ে ব্যাংক এশিয়ার চাচুড়ী বাজার শাখার এজেন্ট খায়রুল বাশার গা ঢাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে, টাকা জমা হয়নি—এই খবর পেয়ে গ্রাহকেরা হতাশ হয়ে ভিড় করছেন ব্যাংকে। এরই মধ্যে ব্যাংক থেকে গোপনে কম্পিউটার সরানো এবং ৫০ হাজার টাকা ভাড়া বকেয়া থাকায় ভবন মালিক ওই ব্যাংকে তালা মেরে দিয়েছেন।

ব্যাংক এশিয়া সূত্রে জানা গেছে, কালিয়া উপজেলার চাচুড়ী বাজার শাখাটি ২০১৯ সালের জুন মাসে স্থাপিত হয়। সেখানে স্থানীয় চন্দ্রপুর গ্রামের খায়রুল বাশার এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ পান। বর্তমানে শাখাটিতে ডিপিএস, মেয়াদি আমানত ও সঞ্চয়ী হিসাব মিলে এক হাজার ৩০০ জন গ্রাহক নিয়মিত লেনদেন করেন। এর মধ্যে বেশিরভাগই মেয়াদি আমানতের গ্রাহক। প্রতি মাসে দুই হাজারের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে থাকেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ব্যাংকটিতে পল্লীবিদ্যুতের বিল নেওয়া শুরু হয়। আশপাশের চারটি ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজার গ্রাহক এখানে বিদ্যুৎ বিল জমা দেন। মার্চ মাস থেকে বিদ্যুৎ বিলে বকেয়া আসতে থাকায় গ্রাহকেরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, জমাকৃত বিলের টাকা পল্লীবিদ্যুৎ অফিসে জমা হয়নি। এই অবস্থা পরবর্তী এপ্রিল ও মে মাসেও চলতে থাকে। পরে ধীরে ধীরে বের হতে থাকে অন্য জামানতের টাকার হিসাব।

অভিযোগ উঠেছে, ব্যাংকিং পদ্ধতির বাইরে নিজ উদ্যোগে গ্রাহককে এককালীন জামানতে মাসিক বেশি অর্থের লোভ দেখান বাশার। এভাবে কয়েকশ গ্রাহকের কাছ থেকে এককালীন জামানত নিয়ে ব্যাংকে জমা না দিয়ে হাতিয়ে নেন তিনি। এমনকি এজেন্ট অফিসে ১০ থেকে ১২ জন কর্মী নিয়োগ দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে জনপ্রতি দুই থেকে চার লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে এজেন্ট কাম এমডি খায়রুল বাশারের বিরুদ্ধে।

ডহর চাচুড়ী গ্রামের মৎস্যজীবী পিটু বিশ্বাস। বাড়ি বানানোর জন্য মাছ ধরে তিন লাখ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। লাখে মাসিক ৮০০ টাকা পাওয়ার আশায় স্ত্রী লাকিয়ার নামে তিন লাখ টাকা জামানত রেখেছিলেন। গত মঙ্গলবার ব্যাংকে এসে জানতে পারেন, তাঁর নামে ব্যাংকের হিসাবে কোনো টাকাই জমা হয়নি।

পিটু বিশ্বাস বলেন, ‘ঘরের জন্য কিছু টাকা জমাইছিলাম। ভাবছিলাম আরও কিছু জমায়ে ঘরটা তুলব। এখন আমার ঘর তোলার স্বপ্নই নষ্ট করে দিল এই এজেন্ট বাশার।’

চাচুড়ী গ্রামের কোহিনূর বেগম আড়াই লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রেখে দুই মাসে মুনাফা পান। মে মাসে মুনাফার টাকা নিতে এসে দেখেন ব্যাংকে তালা মারা, এজেন্টও নেই। অসহায় কোহিনূর বলেন, ‘ছেলের পাঠানো টাকা জমিয়ে অনেক কষ্টে টাকাগুলো জমা রেখেছিলাম। এখন তো সবই হাওয়া। আমি কি আত্মহত্যা করব নাকি?’

এভাবেই ডহর চাচুড়ী গ্রামের মফিজুর রহমানের ১৫ লাখ, পুরুলিয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর শেখের ১২ লাখ, হাসান শেখের দেড় লাখসহ কয়েকশ গ্রাহকের দুই কোটি জামানতের টাকার কোনো হদিস নেই।

আরও অভিযোগ ওঠে, ব্যাংক শুরুর পর কর্মীদের চাকরি দেওয়ার নাম করে দুই থেকে চার লাখ টাকাও নিয়েছেন বাশার। নিজস্ব কায়দায় মাসিক লাভের কথা বলে হাতিয়ে নেওয়া টাকার ব্যাপারে মুখ খুলতে শুরু করেছেন কর্মীরা। এর মধ্যে ফারজানার কাছ থেকে দুই লাখ, ফজিলার কাজ থেকে দুই লাখ, লাকি খানম আর অনিক নামের দুই কর্মীর কাছ থেকে চার লাখ টাকা নেয় তিনি। এসব কর্মীরা ক্ষোভে ফুঁসলেও বাইরের গ্রাহকের গালমন্দ শুনছেন।

দিকে এমন জালিয়াতির অভিযোগে ক্ষুব্ধ বাজারের ব্যবসায়ীরা। চাচুড়ী বাজার বনিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘ব্যাংকে মানুষ আস্থা নিয়ে টাকা জমা রাখে, আর তা লুট হয়ে যায়। আমি প্রশাসনের কাছে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করছি। গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে এজেন্ট পালিয়ে গেল, অথচ তা ধরতেই পারল না ব্যাংকের কর্মকর্তারা।’

ব্যাংক এশিয়া কর্তৃপক্ষের দাবি, ব্যাংকের ভুয়া ভাউচার ছাপিয়ে সেই ভাউচারে গ্রাহকের টাকা হাতিতে নিয়েছেন এজেন্ট বাশার।

নড়াইল জেলা ম্যানেজার ফিরোজ আহম্মেদ বলেন, ‘ব্যাংকের প্রকৃত ভাউচারে টাকা গ্রহণ করলে গ্রাহক তা ফেরত পাবেন। মূলত টাকা জমা হওয়ার পর রশিদ প্রিন্ট হয়ে বের হয়। কিন্তু এখানে অধিকাংশ ভাউচারই নকল।’

ঢাকা থেকে আসা ব্যাংক এশিয়ার অডিটর আব্দুল্লাহ বাকী বলেন, ‘আমরা গ্রাহকের অভিযোগ সংগ্রহ করছি। এখানে এজেন্ট যে ধরনের জালিয়াতি করেছেন, তার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ আইনগত ব্যবস্থা নেবে।’

ব্যাংক এশিয়ার রিলেশনশিপ কর্মকর্তা লিকু আহম্মেদ জানান, ‘এজেন্ট বিদ্যুৎ বিলের টাকা জমা নিয়ে রশিদ দিলেও সেই টাকা ব্যাংকে জমা করেননি। গত বুধবার পর্যন্ত এজেন্ট কর্তৃক ৩২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পেয়েছি। এজেন্ট শাখাটিতে নিরীক্ষা কাজ চলছে।’

এদিকে এজেন্ট খায়রুল বাশারকে দুদিন ধরে ফোন দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি কালিয়ার ডিজিএম মো. মমিনুর রহমান বিশ্বাস বলেন, ‘এলাকার প্রায় দুই হাজার গ্রাহক সেখানে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ওই সব গ্রাহকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক টাকা নিলেও এজেন্ট সেই টাকা জমা না দেওয়ায় গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে। ঘটনাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

সহকারী পুলিশ সুপার (কালিয়া সার্কেল) প্রনব কুমার সরকার বলেন, ‘পুলিশ চাচুড়ী বাজারের এজেন্ট ব্যাংকিং বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে। এলাকার মানুষের অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’