বৃহঃ. অক্টো ২১, ২০২১

খোলাবাজার২৪, সোমবার, ০৪ অক্টোবর ২০২১:আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী:বাংলাদেশে নির্বাচনের এখনো দুবছর বাকি। ইতোমধ্যেই নির্বাচনি প্রচারণার ধুমধারাক্কা শুরু হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলকে নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য মাঠে নামার নির্দেশ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের জেলা-উপজেলা, এমন কী ইউনিয়ন পর্যায়ে দল গোছানোর তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। বিএনপি মুখে বলছে হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না; কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে দল গোছাতে মাঠে নেমেছে।

বিএনপির নির্বাচনি মিত্র কারা হবে, তা এখনই বোঝা যায়। জামায়াত ও হেফাজত তো থাকবেই, সুশীলসমাজেরও একটা বড় অংশ তাদের সঙ্গে থাকবে। আওয়ামী লীগের পুরোনো মহাজোট থাকবে, কী থাকবে না; থাকলে জাসদ (ইনু), মেননের ওয়ার্কার্স পার্টি এবং অনুরূপ দলগুলো তাদের শক্তি যতই ক্ষুদ্র হোক, আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিতে দৌড়ে আসবে কিনা, না নতুন নির্বাচনি জোট গঠন করবে, তা নিশ্চিত নয়।

ড. কামাল হোসেন এবার সম্ভবত কোনো নির্বাচনি জোটেই পাত্তা পাবেন বলে মনে হয় না। তার প্রতিনিধি হয়ে যিনি গণফোরাম দলটি চালাচ্ছেন, সেই মোকাব্বির খানের প্রবণতা আওয়ামী লীগের দিকে। গণফোরাম এবার আওয়ামী লীগের মহাজোটে যোগ দেওয়ার চেষ্টা চালাতে পারে। মরহুম এরশাদ সাহেবের ভাঙা জাতীয় পার্টির একটা অংশ আওয়ামী লীগে এবং অন্য অংশ বিএনপির সঙ্গে জুটলে বিস্ময়ের কিছু নেই।

সুশীলসমাজ ও মিডিয়া সাপোর্ট আওয়ামী লীগ বড় একটা পাবে না। সুশীলসমাজ এবং তাদের ‘নিরপেক্ষ দৈনিকটি’ এখন কিছুটা নির্জীব ও নির্বাক। নির্বাচনের ডামাডোল বাজলেই দেখা যাবে তারা সজীব হয়ে উঠেছেন। তাদের মুখে বোল ফুটেছে। তা হুল হয়ে সরকারের গায়ে বিঁধছে। যে ‘নিরপেক্ষ’ দৈনিকটি শেখ হাসিনার জন্মদিনের খবর ফার্স্ট লিড করেছে, সময়মতো সে চেহারা পালটাবে।

বর্তমান সরকারকে যদি বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবি মেনে নিতে হয়, তা হবে নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরাজয়। অতীতে দেখা গেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোকে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে ম্যানুপুলেশনের কাজে বিএনপির জুড়ি নেই। আওয়ামী লীগের দাবি অনুযায়ী, বিএনপি প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে রাজি হয়েছিল। কিন্তু রাতের অন্ধকারে সংসদের অধিবেশন ডেকে সেনাবাহিনীর দায়িত্বভার রাষ্ট্রপতির হাতে রাখার ব্যবস্থা তারা করেছিল। তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিএনপির মনোনীত সাবেক রাজাকার আবদুর রহমান বিশ্বাস।

এই রাজাকার রাষ্ট্রপতির সাহায্যে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানের প্রথম জাতির উদ্দেশে দেওয়া বেতার ও টেলিভিশন ভাষণ গোপনে কাটছাঁট করে বিএনপি। এমন কী সেনাবাহিনীতে অনুগত সেনা অফিসার দিয়ে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর চক্রান্তও করেছিল। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলকেও বিএনপি মানতে রাজি হয়নি। বলেছে, তাদের জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বারা নির্বাচিত নতুন রাষ্ট্রপতি জাস্টিস সাহাবুদ্দীন আহমদের নতুন সংসদ উদ্বোধনের ভাষণদানের দিনটিতেও সংসদ বর্জন করে বিএনপি।

তারপর কী এক রহস্যজনক কারণে আওয়ামী লীগের মনোনীত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন বিএনপি নেত্রীর অত্যন্ত প্রিয় হয়ে ওঠেন। রাষ্ট্রপতি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ছুটে যান তাকে দেখতে। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে খালেদা জিয়া বেশি সময় পান প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও। রাষ্ট্রপতির ‘কনসাস-কীপার’ হয়ে ওঠেন বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক, বিএনপির তখনকার সমর্থক সুশীলসমাজের নেতারা যেমন-ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রমুখ। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় নিরপেক্ষতার মুখোশ ঢাকা দুটি পত্রিকার সম্পাদক।

২০০১ সালে নির্বাচনের আগে বিএনপির পক্ষে তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান লতিফুর রহমান অবস্থান নেন। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে হারানোর জন্য তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত মেরি অ্যান পিটারস-এর নেতৃত্বে বিদেশি কূটনীতিকদের ক্লাব টুয়েসডে ক্লাব প্রকাশ্য ভূমিকা নেয়। নির্বাচনে বিএনপির ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি দেখানো হয়। নির্বাচনের পর দেশে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের রক্তের স্রোত প্রবাহিত হয়। পূর্ণিমা শীলের মতো অসংখ্য নারী গণধর্ষণের শিকার হয়।

পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও হাইজ্যাক করে বিএনপি। এ সময়েও রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিএনপির মনোনীত ইয়াজউদ্দীন। আত্মসম্মানহীন এ ব্যক্তি ছিলেন তারেক রহমানের অঙ্গুলি নির্দেশে চালিত। তিনি এই নির্দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত হতে দেননি। তিনি তারেক রহমানের নির্দেশ মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের কার্যকলাপে হস্তক্ষেপ করতে থাকেন। উপদেষ্টারা বিরক্ত হয়ে একে একে পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতি নিজেই নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ঘোষণা করেন। দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করেন। একটি দলীয় নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। যে ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়, তাতে ছিল আড়াই কোটি জাল ভোটারের নাম।

দেশব্যাপী তখন অরাজকতা। জামায়াতের সঙ্গে মিলে বিএনপি এই অরাজকতা তৈরি করেছিল। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও মিত্র দলগুলো গণআন্দোলনের জন্য প্রস্তুত। দেশে একটা ভয়াবহ সিভিল ওয়্যার হতো। এ সময় সামরিক বাহিনী দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে। ইয়াজউদ্দীনের তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভেঙে দেওয়া হয়। ড. ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। তার পেছনে প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল ড. কামাল হোসেন ও ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সুশীলসমাজের।

তাদের ইচ্ছা ছিল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আসতে না দিয়ে সেনাবাহিনীর সমর্থনে একটি অনির্বাচিত ‘সুশীল সরকার’ গঠন। এ উদ্দেশ্যে ড. ইউনূস একটা ক্রেডিট কার্ড রাজনৈতিক পার্টি খাড়া করেছিলেন এবং ড. কামাল হোসেন মাইনাস টু থিয়োরি তৈরি করেছিলেন। শেখ হাসিনার পেছনে প্রবল জনসমর্থনের ফলে এক-এগারোর মাইনাস টু থিয়োরি ব্যর্থ হয়ে যায়। দেশের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে ক্ষমতায় এসে এখনো ক্ষমতা আছে।

২০০৮ সালের পর আরও দুটি সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেছে এবং তা আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই। বিএনপির অভিযোগ, দুটি নির্বাচনই আওয়ামী লীগ কারসাজি করে জিতেছে। সুতরাং হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তারা আর নির্বাচনে যাবে না। তারা আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছে। এ দাবি আদায়ে গণআন্দোলন করার হুমকি-ধামকি দিচ্ছে।

কিন্তু আওয়ামী লীগ কি তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামক এই ‘নিষিদ্ধ ফলটি’ আবার খেতে চাইবে এবং খেয়ে আবার আদমের মতো স্বর্গচ্যুত হবে? এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ দূষিত ও ব্যর্থ করে দিয়েছে বিএনপি। এই পদ্ধতি দ্বারা বাংলাদেশে আর কোনো নির্বাচন অদূর ভবিষ্যতে অনুষ্ঠান সম্ভব নয়, পদ্ধতিটাকে বিষাক্ত করে ফেলেছে বিএনপি। এটা দ্বারা কোনো গণতান্ত্রিক ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। বিএনপি আগের মতোই লতিফুর রহমান, ইয়াজউদ্দীনদের দলের ক্রীড়নকের মতো ব্যবহার করবে। প্রধান উপদেষ্টা পদে নিজেদের পছন্দের লোকদের বসানোর জন্য বিচারপতিদের বয়স কমানো-বাড়ানোর চক্রান্ত করবে।

এক কথায়, যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিটি পচে গিয়ে এখন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, তা দেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা কিছুতেই উচিত হবে না। এ পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা হলে নির্বাচন মোটেই অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না। বিএনপির ম্যানুভারিং সফল হবে। দেশে অরাজকতা দেখা দেবে। নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো নির্যাতিত হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের অবনতি ঘটবে।

বিএনপি এখন মরা ধানের শীষ। আন্দোলনের হুঙ্কার দেবে, ওই পর্যন্তই। আন্দোলন করার শক্তি তাদের নেই, তাই এই হুঙ্কার। শূন্য কলসি গর্জায় বেশি। বিএনপিও যতই দিন যাবে, ততই বেশি গর্জাবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না। সুশীলসমাজ বিবৃতিবিশারদ। এদের কথায় চিড়ে ভিজবে না। তবে আওয়ামী লীগ সরকারকে আন্তর্জাতিক তথা পশ্চিমা চাপের কথা মনে রাখতে হবে। গত দুটো নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একচেটিয়া জয় সম্পর্কে বিরূপ প্রচারণা কম হয়নি। হাসিনা সরকারের প্রতি বাইডেন-প্রশাসনের মনোভাব এখনো স্পষ্ট নয়। সম্প্রতি বাইডেনের সঙ্গে হাসিনার সাক্ষাৎ হয়েছে। তাতে দুদেশের সম্পর্কের উন্নতি হতে পারে। উন্নতি হলে এবার নির্বাচনে স্বচ্ছতা প্রমাণের জন্য পশ্চিমা দেশগুলো থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর জোর চাপ আসবে মনে হয়।

আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন প্রস্তুতির জন্য তার দলকে জোর চাপ দিয়েছেন। তার দল তৎপর। অন্যদিকে বিএনপিও হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বললেও নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেছে। মনে হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে সরকারকে নির্বাচনের স্বচ্ছতা প্রমাণ করার জন্য অনেক আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে নিতে হবে। অন্যদিকে বিএনপিকে এবার অস্তিত্বের স্বার্থেই নির্বাচনে আসতে হবে। তবে শীর্ষ নেতৃত্বে তারেকের অবস্থান চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে। বিএনপি ভেঙেও যেতে পারে।

কেউ কেউ বলছেন, বিএনপির সেক্যুলারপন্থি খণ্ডাংশ দল থেকে বের হয়ে সম্ভাব্য বাম গণতান্ত্রিক জোটের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। অন্যদিকে তারেকের সহযোগী ও সমর্থকরা জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গে আরও মিশে গিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা নতুন অবস্থান তৈরি করতে পারে। ভারতের বাম রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের বাম গণতান্ত্রিক দলগুলো যতই শক্তিহীন হোক, আওয়ামী লীগের নৌকায় চড়ার অভ্যাস ত্যাগ করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এবার ছোট একটা আশার মোমবাতি জ্বালাতে পারে কিনা, দেখা যাক।