খোলাবাজার২৪, শনিবার, ০৪ডিসেম্বর,২০২১ঃ বাবা, কিছু দিন থেকে ভাবছি তোমাকে নিয়ে কিছু লিখব কিন্তু ইচ্ছে করেই যেন আবার দূরে থাকা, বেশকিছুদিন ধরেই তোমাকে খুব মনে পড়ছে, অনেক অদ্ভুত কিছু চিন্তা মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছে। আমি আমার কল্পনার জগতে তোমার ছবি আঁকি, তোমাকে দেখিনা প্রায় তিন বছর হতে চলল, কি আশ্চর্য তাই না? ভাবি এই তিন বছরে তোমার কতটুকু পরিবর্তন হতো ? তোমাকে দেখতে কেমন লাগত এখন ? জানো বাবা আমি রাস্তাঘাটে যখন বয়স্ক কোন লোক দেখি তোমার কথা মনে মনে ভাবি যে এখন হয়তো বাবাকে দেখতে ঠিক এমনই লাগত!
বাবাকে হারানোর ব্যথা প্রকাশের শক্তি বা ভাষা আমার নাই। অনেকদিন পর আজ এইটুকু লিখতে বসলাম বাবার জন্য। অন্তরটা এক মহা শুন্যতায় সবসময় হাহাকার করতে থাকে বাবার জন্য। যেন জলন্ত একটা আগ্নেয়গিরিতে পরিনত হয়ে গেছে আমার অন্তরটা, যা থেকে সবসময়ই আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মতো কষ্টের লাভা নির্গত হতে থাকে । আগ্নেয়গিরিতে অগ্নুৎপাত হয়তো এক সময় থেমে যায় , কিন্তু প্রিয়জন কে হারানোর কষ্টের যে লাভা নির্গত হয়, তা কখনোই থামেনা. বরং সময়ের সাথে সাথে হারানোর কষ্টের যন্ত্রণার আগুন আরও বেড়ে যায়। বাবাকে আমি খুবই ভালবাসি। বাবা ছিলেন আমার সব। বাবা ছাড়া আমি যেন কিছুই না। গত তিন বছর আগেও আমার বাবা এই পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন। আর এখন সবই স্মৃতি। বাবাকে পাই অনুভবে।
আমি গত ২৮/১১/২০১৮ ইং তারিখ ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যাই বাবার সাথে কিছু দিন থাকার জন্য। ৩০/১১/২০১৮ ইং তারিখ বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হবার সময় বাবাকে বললাম, বাবা এবার আমি ঢাকা ফিরে যাই। বাবা আমার চলে যাওয়ার কথা শুনে কান্না শুরু করলেন। বললাম, বাবা আমার ছুটি শেষ। কয়েকদিন পর আবার আসবো। আমার এই কথা শোনার পর বাবা বললেন, আমাকে একা রেখে তুমি যেওনা। কিন্তু আমি বাবার আবদার রাখতে পারলাম না। বাবাকে বাড়িতে মায়ের কাছে রেখেই আমাকে ঢাকা চলে আসতে হলো । শুক্রবার রাতে ঢাকা পৌছলাম। আর বাবা শনিবার থেকেই খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিলেন। বাড়ির সবার কাছে বারবার আমার কথা জিজ্ঞাসা করলেন, আরিফ কবে বাড়ি আসবে ? তারা বললো আরিফ কয়েকদিন পরে আসবে। বাবার মন তা মানতে চাইলো না। বাচ্চাদের মতো বলতে থাকলেন, আরিফকে তাড়াতাড়ি বাড়ি আসতে বলো।
এইমাত্র এলাম এখনই আবার অফিস থেকে ছুটি পাই কিনা এই ভেবে বাড়ির কেউ আমাকে বাবার কথা গুলো বলেননি। আমি চিন্তা করবো তাই।
বাবা মারা যাওয়ার আগেরদিন সন্ধ্যা ৭.১৫ মিনিটে গ্রামের বাড়ি থেকে আমার বোন ও ফুফাতো ভাই আমাকে ফোন দিয়ে বললেন, বাবার শারীরিক অবস্থা খুব বেশি ভালো নয়, বার বার নাকি আমাকে খুঁজতেছেন। আমাকে দেখার জন্য উতলা হয়ে উঠছেন। আমি বড় বোনকে বললাম বাবাকে বলতে যে আমি আসতেছি।
তখন আমি অফিসে ছিলাম, অফিস থেকে রওয়ানা হলাম বাড়ির উদ্দেশে, রাত ৮.১৫ মিনিটের গাড়িতে উঠে সকাল ৯ টায় বাবার কাছে পৌঁছলাম।
বাবার ঘরে গিয়ে বাবাকে সালাম দেওয়ার সাথে সাথে আমাকে দেখে বললেন, আসছো বাবা ? তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি। বাবার কথাটা শুনে আমার কান্না এসে পড়ল। আড়াল করে বললাম, বাবা আমি এসে গেছি এবার অনেকদিন থাকব আপনার কাছে। বুঝতে পারলাম বাবা আমাকে দেখে অনেক খুশি হয়েছেন। বাবাকে বললাম, বাবা আমি আসার সময় কুমিল্লার মাতৃভান্ডার থেকে আপনার জন্য দই নিয়ে আসছি, আপনাকে একটু খাওয়াই দিবো ? বাবা বললেন, দাও। ছয়দিন পর বাবা আমার নেয়া দই থেকে এক চামচ দই খেয়ে বললেন এখন আর খাবো না, পরে খাবো। কিছুক্ষণ পর বাবা নিজ থেকেই আবার দই খেতে চাইলেন। আমি বাবাকে আরো দুই চামচ দই খাইয়ে দিলাম। ওইটুক খেয়ে বললেন, আর খাব না। এটাই ছিল বাবার শেষ খাওয়া। দই খাওয়ানোর পর বললাম, বাবা আপনার পাশে বসে কিছুক্ষণ পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করি ? বাবা বললেন, করো। পবিত্র কোরআন শরীফ খুলে বাবা কে বললাম বাবা সূরা ইয়াসিন পড়ি ? বাবা বললেন, পড়ো। বাবার সামনে বসে সূরা ইয়াসিন পড়ে শোনালাম। কোরআন তিলওয়াত করার পর বাবার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করলাম।
আমি বাবার কাছ থেকে এক মুহুর্তও দূরে যাইনি। বেলা ১২.৩০ মিনিটে বাবাকে বললাম, বাবা আপনাকে গরম পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দেই ? বললেন, দাও। ১২.৪০ মিনিটে বাবাকে আমি কোলে করে রুম থেকে বারান্দায় নিয়ে গেলাম। তারপর চেয়ারে বসিয়ে গোসল করায়ে দিলাম। গোসল শেষ করে আবার কোলে করে বাবার ঘরে নিয়ে আসছিলাম। ওই সময়ই আমার কোলেই আমার বাবা আমাদের সবাইকে ছেড়ে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আমার হাতে তার শেষ গোসল আর আমার কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন আমার বাবা।ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নইলাহি রাজিউন।
ছোটবেলায় দেখতাম কেউ মারা গেলে আত্মীয়া স্বজনেরা বিলাপ করে কাদেঁ, আমি বুঝতাম না ব্যাপারটা, কি কি যেন বলে, বিলাপ করার কি আছে ? ইচ্ছাকৃত এমন করে নাকি অন্যকিছু ! যেদিন বাবাকে হারালাম সেদিন আমি নিজেও অনেক বিলাপ করে কেদেঁছি, আমার সেই বিলাপে আমি আর কি কি বলেছিলাম আমার মনে নেই কিন্তু এমনই কিছু বলতে মন চাইতো যা বললে অন্তরটা ঠান্ডা হয়, ভিতরের জ্বালা কমে ! প্রিয়জন হারালে হয়ত এমনই হয় সবার, তাই বিলাপ করে !
মাঝে মাঝে তোমার কথা খুব মনে পরে, মাথায় অনেক ভাবনা ঘোরপাক খায়, ভাবি এভাবে করলে হয়তো বাবা বেচেঁ থাকতো, আর একটু যদি যত্ন নিতাম বাবা বেচেঁ যেত, থাকতো আমাদের মাঝে ! কত খুশি হত, কত আনন্দ করত আজকে ! আমি তোমার এত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কোন কারনই খোঁজে পাই না, কেন চলে গেলা তুমি বাবা, আমি না কিছুই মেলাতে পারি না। আমার কেন যেন বেশি আনন্দ পেতে ইচ্ছে করে না, কোন সুখের স্বাদ নিতে মন টানে না, যা করি কেবল করতে হবে বলেই করে যাচ্ছি, ভিতরটায় কেমন শূন্যতা !
বাবাকে যুদ্ধের সময়ে পাক বাহীনির লোকজন বাড়ি থেকে তুলি নিয়ে যায় মারার জন্য। আমার বাবা সহ প্রায় বিশ জন লোক কে মারার জন্য লাইনে দাড়াতে বলেন পাক বাহিনি। বাবা সবার সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে মনে মনে দোয়া পড়ছেন, এমন সময় আমাদের এলাকার এক রাজাকার পাক বাহিনিরদের বললেন লাইনেতো একজন সরকারি মাস্টার রয়েছে, তখন পাক বাহিনির লোকজন বললেন কে সেই মাস্টার ? তখন বাবা বললেন আমি। সরকারি চাকুরি করার কারনে বাবা সেইদিন বেছে গিয়েছিন।
বাবা মেট্রিকুলেশন পাশ করার পর অনেক লোক বাবা কে দেখতে এসেছেন। কারন তখনকার সময় মেট্রিকুলেশন পাশ করা লোক ছিল হাতে গোনা কয়েকজন।
বাবা যে স্কুলে বদলি হতেন সেই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা বৃত্তি পেতো। প্রতিদিন সকালে বাবা যখন স্কুলে যেতেন তখন বাবা সাথে করে একটি হারিকেন নিয়ে যেতেন। কারন যে সকল ছাত্র ছাত্রী বাবার ক্লাসের পড়া আদায় করে দিতে পারতেন না তাদের কে নিয়ে বাবা সন্ধ্যা ৭ টা ৮ টা পর্যন্ত ক্লাস করাতেন। এই জন্য বাড়ি থেকে হারিকেন নিয়ে স্কুলে যেতেন। হারিকেন নিয়ে বের হবার আরোও একটি কারন ছিল, সেটা হলো বাবা স্কুল শেষ করার পর নিজ বাড়ি আসার আগে তার স্কুলের সকল ছাত্র ছাত্রীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখে আসতেন, তারা ঠিক মত পড়া লেখা করেন কিনা। বাবার ভয়ে ছাত্র ছাত্রীরা রাতে ঠিক মত পড়া লেখা করতেন হয়তোবা এই জন্যই তারা পরিক্ষায় ভাল ফলাফল করতেন।
স্কুলকে বাড়ির ন্যায় ভালবাসতেন বলে স্কুল প্রাঙ্গণ গাছপালা আর ফুলে ভরিয়ে দিতেন। মন্তলা ও শালধর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে কটি বড় গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে তা বাবার লাগানো। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন তিনি।
বাবা যে ভালো মানুষ তা আমরা সহজে বুঝতে পারতাম। কখনো কোথাও একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে কিংবা সন্ধ্যা নাগাদ বাজারে দেখলে অনেকেই (পরিচিত কিংবা অপরিচিত) আমাকে বলতেন ‘এই মাস্টারের ছেলে এখানে কী করছো, বাড়ি যাও, বাড়ি যাও’। সকলে এভাবে চোখে চোখে দেখে রাখতেন। বাবা যেদিন চাকরি মেয়াদ পূর্ণ করলেন সেদিন তার স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চোখে পানি দেখেছি। বিশাল এক দল ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষক-শিক্ষিকা মিলে বাবাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যান।
গত ৬/১২/১৮ ইং তারিখ দুপুর ১ টায় আমার বাবা জনাব আলহাজ্ব মাস্টার মোহাম্মাদ মোস্তফা (৮০) চলে গেছেন না ফেরার দেশে। রেখে গেছেন মায়ার বন্ধন, সুখের সংসার, বিচরণ ভূমি, সন্তান সন্ততি, আত্মীয় স্বজন, পবিত্র শিক্ষাঙ্গন, ও হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রী ; আর তার আদর্শ।
আজকে তিন বছর পর আমার জীবনে অনেক পরিবর্তনই এসেছে, শুধু বাবা নেই, নিজের মধ্যে অপরাধবোধ নিয়েই বলি “বাবা ভাল থেকো ওপারে !! সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন, মহান আল্লাহ যেন আমার বাবাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন। আমিন।