শনি. জুন ১৫, ২০২৪
Logo Signature
Agrani Bank
Rupali Bank
Advertisements

২৪জুলাই খোলাবাজার অনলাইন ডেস্ক : বিদেশে বসেই সক্রিয় সাইবার সন্ত্রাসীরা। লাগামহীনভাবে তারা চালিয়ে যাচ্ছে গুজবসহ সরকার ও দেশবিরোধী নানা অপপ্রচার। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরেই এরা ব্ল্যাকমেল করে যাচ্ছে দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা কিংবা সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের। নিজেদের অবস্থান ও মানসম্মানের কথা ভেবে ভুক্তভোগীদের অনেকেই এ সাইবার-দুর্বৃত্তদের খাই মেটাতে বাধ্য হচ্ছেন; তাদের চাওয়া মোটা অঙ্কের টাকা-পয়সা নীরবে দিয়ে দিচ্ছেন। অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে সে টাকা পৌঁছছে তাদের কাছে। তবে তৃপ্তির বিষয় হলো, এসব সাইবার সন্ত্রাসী নিজেরা মাঝেমধ্যেই নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হচ্ছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টকশোয় কিংবা নিজেরাই ফেসবুক লাইভে এসে একে অপরের অবৈধ কর্মকাণ্ড তুলে ধরছে। তারা নিজেরাই বের করে আনছে লুকিয়ে থাকা থলের বেড়াল। অন্যদিকে এমন ৬০ জন সাইবার সন্ত্রাসীর তালিকা করেছে র‌্যাব-পুলিশসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। এদের মধ্যে শীর্ষ ২৭ জনকে রেডমার্কে রেখে তাদের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে অনেকগুলো সংস্থা। এরই মধ্যে এদের তিনজনের অপরাধের ফিরিস্তি তুলে ধরে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থাকে (ইন্টারপোল) অবহিত করেছে পুলিশ সদর দফতরের এনসিবি শাখা। তবে সাইবার অপরাধীদের লাগাম টানতে না পারার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীদের অনেকেই।
পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) মনজুর রহমান জানান, দেশবিরোধী গুজব কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচারে লিপ্ত থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে পুলিশের সাইবার ইউনিটগুলো কাজ করছে। কেউই নজরদারির বাইরে নয়। সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে। প্রচলিত আইন অনুসারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিদেশে অবস্থান করা সাইবার-দুর্বৃত্তদের বিষয়েও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাইবার সন্ত্রাসীরা প্রথমে একজন বিত্তশালী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে টার্গেট করে। দেশে থাকা তাদের সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে খুঁজে বের করে টার্গেট ব্যক্তির নিজের কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যের সমস্যার বিষয়। তিলকে তাল করে ওই ব্যক্তির ওপর তৈরি করে একটি বিজ্ঞাপন। সেটি তাদের পেজে পোস্ট করে। জানিয়ে দেয়, এ ব্যক্তির ওপর ‘অনুসন্ধানী প্রতিবেদন’ আসছে। তাদের পেজে চোখ রাখার অনুরোধ করে ফলোয়ারদের। তবে অপেক্ষার প্রহর যেন আর শেষ হয় না। ঘোষণা দেওয়া সেই প্রতিবেদন কখনো আলোর মুখ দেখে না। তবে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে রাজি না হলেই সে ব্যক্তির ওপর শুরু হয় সাইবার হামলা। সাইবার অপরাধীরা নিজেদের মতো করে একের পর এক ওই ব্যক্তির ওপর তৈরি করে মনগড়া কাল্পনিক প্রতিবেদন। যা প্রকাশ করে তাদের পেজে।
দুই সাইবার সন্ত্রাসী টিটো রহমান ও নাজমুস সাকিব ইউটিউব চ্যানেল নাগরিক টিভির মালিক সেজে নেমেছেন প্রতারণা ব্যবসায়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অবস্থান করা এ দুই ব্যক্তির আদতে কোনো পেশা নেই। ফেসবুক ও ইউটিউবে একটি চ্যানেল খুলে নিয়মিতভাবে টার্গেট ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেলিংই তাদের পেশা। সেখানে নিয়মিতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু পরিবার, দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, শিল্পগ্রুপসহ বিভিন্নজনের নামে অশালীন, মিথ্যা ও আজগুবি মন্তব্য করেন তারা। এ ছাড়া কিছুদিন আগে তারা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনকে খোলা চিঠি নামে বিভিন্ন অবান্তর বিষয়ের অবতারণা করে বিষোদগার ছড়ান। এ ছাড়া কয়েকজন ইউটিউবার ও ফেসবুকে বাংলাদেশ থেকে স্বেচ্ছায় পালিয়ে যাওয়া কয়েক ব্যক্তি তাদের সঙ্গে নিয়মিত টকশোয় অংশ নেন। শীর্ষ ২৭ সাইবার অপরাধীর অন্যতম একজন হলেন ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া পিনাকী ভট্টাচার্য নামের এক চিকিৎসক। তার টার্গেটের অন্যতম হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু পরিবারের লোকজন। তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে ধর্মীয় উসকানি ছড়াতে ইউটিউবে তার নিজ চ্যানেলে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন বিধান নিয়ে কট্টর সমালোচনা করে চলেছেন নিয়মিত। এক বছর ধরে তিনি কিছু উদ্ভট যুক্তি উপস্থাপন করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স না পাঠাতে উসকানি দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহের মতো অপরাধ করে চলেছেন। এসব থেকে বাদ যাচ্ছেন না বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। সম্প্রতি সাইবার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তার ছবি প্রকাশের পর চাঞ্চল্য তৈরি হয়। অনেকে মনে করছেন তিনি তাদের সঙ্গে বৈঠক করে সাইবার অপরাধে উসকানি দিচ্ছেন। এতে বিস্মিত হয়ে অনেকে বলেন, এ আচরণ যে আইনের ভয়ংকর লঙ্ঘন সেটি তাকে মনে করিয়ে দেওয়ার মতো কেউ কি বিএনপিতে নেই?
সাইবার অপরাধীদের কর্মকান্ড নিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘আসলে বিষয়টি স্বরাষ্ট্র, আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। ২০১৫ সালে আমি যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম তখন আমরা ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগই করতে পারতাম না। এখন তো ফেসবুক ও ইউটিউব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ হয়। আমাদের জন্য তারা একজন বাঙালি কর্মকর্তাও রেখেছে।’
২৮ এপ্রিল ১০টা ৫৭ মিনিট। দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত গ্রুপ কাজী ফার্মসের মালিক কাজী জাহেদুলের বিরুদ্ধে একটি স্ট্যাটাস দেয় নাগরিক টিভি। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ক কোনো প্রতিবেদন দেখা যায়নি কথিত নাগরিক টিভি নামের সেই ফেসবুক পেজ কিংবা ইউটিউবে। তারা পরিকল্পিতভাবে সম্মানহানি করতে এমন ঘটিয়েছে।
৭ এপ্রিল ১১টা ৪২ মিনিট। এনআরবি ব্যাংকের অন্যতম শেয়ারহোল্ডার এবং চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমান নাসিরকে নিয়ে স্ট্যাটাস দেয় নাগরিক টিভি। সঙ্গে ছিল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াতের সঙ্গে ছবি-সংবলিত বিশেষ পোস্টার। ওই মাসেই এ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা ছিল তাদের। চোখ রাখতে বলা হয়েছিল নাগরিক টিভির ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে। একইভাবে গত ৪ এপ্রিল ‘নাগরিক টিভি এক্সক্লুসিভ : দুবাইয়ে টাকা পাচারের কুখ্যাত তিন বন্ধুর ভয়ংকর সিন্ডিকেট’ শিরোনামে আরও একটি স্ট্যাটাস দিয়ে এ বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত থাকার বিষয়টি জানানো হয়। তবে এ-সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
৬ এপ্রিল যমুনা ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিপুকে নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেওয়া হয় নাগরিক টিভি নামের সেই কথিত পেজে। সেখানে সিটি ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ক্রেডিট কার্ড চুরি করে অর্ধকোটি টাকা তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। স্ট্যাটাস দিলেও ওই বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি তারা।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি এক্সিম ব্যাংকের মালিক নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার পরিবারকে নিয়ে স্ট্যাটাস দেয় নাগরিক টিভি। বিস্তারিত জানতে নাগরিক টিভিতে চোখ রাখতে বলা হয়। এর আগে ২৪ জানুয়ারি এ বিষয়ে আরও একটি স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে কাউকে নিয়ে তারা কোনো প্রতিবেদন করেনি। ব্যবসায়ীদের সুনাম ক্ষুণœ করতে এভাবে তারা সবাইকে ব্ল্যাকমেলিং করে চলছে।
সাইবার অপরাধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সাইবার সন্ত্রাসীরা কোনো ব্যক্তিকে সাইবার দুনিয়ায় গুজব ছড়িয়ে হেয়প্রতিপন্ন করতে তার শত্রুপক্ষের কাছ থেকে কন্ট্রাক্ট নেয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তারা প্রতিবেদন তৈরি করে নিজেদের পেজে আপলোড করে। পরবর্তী সময়ে তাতে ডলার খরচ করে ভাইরাল করে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, এক পর্বের প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর ভুক্তভোগীরা তাদের নিজেদের মানসম্মান রক্ষার জন্য সাইবার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে এক ধরনের রফা করতে বাধ্য হচ্ছেন। দুর্বৃত্তদের তুষ্ট রাখতে টাকা দিচ্ছেন। মধু খেয়ে হার্মাদরা নষ্টামি মুলতবি রাখে। কিন্তু লোভাতুর দুর্বৃত্ত লালসার ছোবল নিয়ন্ত্রণে অপারগ। তাই দেখা যায়, কিছুদিন পরপরই ব্ল্যাকমেল করার মতলবে শিকার নিশানা করছে সাইবার দুর্বৃত্তরা।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পুলিশ সদর দফতরের এনসিবি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা শীর্ষ কয়েকজন সাইবার অপরাধীর বিষয়ে ইন্টারপোলে যোগাযোগ করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে কেবল পুলিশ চাইলেই হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকেও বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। তবেই তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করা সম্ভব। সমন্বিতভাবে কাজটি হচ্ছে কি না তা আপনারাই খোঁজ নিয়ে দখুন না!’ মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ভিতরে তাদের কিছু এজেন্ট রয়েছে। তাদের অনেককে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও অনেকের প্রতি চোখ রয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। মূলত তারাই অর্থ আদায় ও হুন্ডির মাধ্যমে তা ওদের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। যে কোনো সময় তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।