Thu. Jun 4th, 2026

7খোলা বাজার২৪, শুক্রবার, ১ জানুয়ারি ২০১৬: পৌরসভা নির্বাচনে বড় ধরনের সহিংসতা হয়নি। তবে বিজয়ী ও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে ভোটের অস্বাভাবিক ব্যবধান এবং সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সংসদ, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি ভোট পড়ায় এ নির্বাচনকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, মেয়র পদে গড়ে ৭৩ দশমিক ৯২ শতাংশ ভোট পড়েছে। তবে এই পদে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে ৭৪টি পৌরসভায়। আর ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে ৬৩টি পৌরসভায়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনে গত বছরের মে মাসে তিন ধাপে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৬২ থেকে ৬৪ শতাংশ। তার আগে ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৪০ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সর্বশেষ ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ভোটের হার ছিল ৪৪ শতাংশ।
ভোট স্থগিত থাকা পৌরসভাগুলো বাদ দিয়ে বাকি ২০৭টি পৌরসভায় মেয়র পদে প্রায় ৬১ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ ভোট দিয়েছেন। সিইসি এই ভোট নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও নির্বাচন বিষয়ে অভিজ্ঞ অনেকেই ভোটের এই হার স্বাভাবিক বলে মনে করছেন না।
প্রথম আলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব পৌরসভায় অনিয়ম ও কারচুপি বেশি হয়েছে এবং যেখানে বিএনপির প্রার্থী দুর্বল বা এজেন্ট ছিল না, সেখানেই ভোট পড়ার হার অন্য এলাকার চেয়ে বেশি ছিল।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন দৃশ্যত শান্তিপূর্ণ ছিল। আড়ালে কিছু ঘটে থাকলে তা উদ্ঘাটন হওয়া প্রয়োজন। তবে গড়ে প্রায় ৭৪ শতাংশ ভোট পড়াটা স্বাভাবিক নয়। এটা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ হলেই তা স্বাভাবিক বলা যায়।
আর ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ সচিবালয়ের পরিচালক আবদুল আলীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোট পড়ার এই হিসাব পুরোপুরি স্বাভাবিক বলব না, তবে অনেকটা স্বাভাবিক বলা যায়। তাঁর মতে, একদিকে এই নির্বাচনে ভোটারদের উৎসাহ বেশি ছিল, অন্যদিকে বেশ কিছু পৌরসভায় অনিয়ম ও ভোট কারচুপি হয়েছে, যার কিছু প্রভাব মোট শতাংশের ওপর পড়েছে।
৯০ শতাংশ ভোট ৫ পৌরসভায়: নির্বাচন কমিশনের ভোটের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে পাঁচটি পৌরসভায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জয়পুরহাটের কালাই (৯২.৪২), রাজশাহীর কেশরহাট (৯২.১৭), নাটোরের নলডাঙ্গা (৯০.৭৬), কুষ্টিয়ার মিরপুর (৯০.৬৭) ও বরিশালের উজিরপুর (৯১.১২)। এসব পৌরসভায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা জিতেছেন।
প্রথম আলোর এই পাঁচটি এলাকার প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নলডাঙ্গার সোনাপাতিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ ভোট পড়ে। চারটি কেন্দ্রে প্রায় এক হাজার ভোটার ভোট দিতে পারেননি। ব্যালট পেপার ফুরিয়ে যাওয়ার অজুহাতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোটারদের ফিরিয়ে দেন। সেখানে বিএনপির প্রার্থী আব্বাস আলী প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি দলের লোকজন নয়, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাই ভোট কারচুপি করেছেন।
কালাইয়ে নয়টি কেন্দ্রের মধ্যে দুটি কেন্দ্র দুপুর ১২টার মধ্যে দখল হয়ে যায়। বেলা দুইটার পর ওই কেন্দ্রগুলো ভোটারশূন্য হয়ে পড়ে। এর প্রতিবাদে বেলা দুইটায় বিএনপি ও জাপার মেয়র পদপ্রার্থীরা ভোট বর্জন করেন। ওই দুটি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯৪.৬৮ ও ৮৪.৭৫ শতাংশ।
উজিরপুরে কোনো সহিংসতা বা দৃশ্যমান অনিয়ম হওয়ার খবর নেই। একটি কেন্দ্র থেকে ব্যালট পেপার গায়েব হওয়ার অভিযোগ আছে। কিন্তু বিজয়ী প্রার্থী পরাজিত প্রার্থীর চেয়ে তিন গুণ বেশি ভোট পেয়েছেন।
কুষ্টিয়ার মিরপুরে বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী অর্ধেকেরও বেশি কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে পারেননি। বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগে ফাঁকা ময়দানে যেনতেন নির্বাচন হয়েছে।
রাজশাহীর কেশরহাটে ৯২ শতাংশের বেশি ভোট পড়লেও সেখানে বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৯৯ ভোট। অথচ আওয়ামী লীগের প্রার্থী ৭ হাজার ৩৪৩ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ৪ হাজার ৯৯৬ ভোট পেয়েছেন।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পৌর নির্বাচনে একজন ভোটারকে তিন ধরনের ব্যালটে সিল দিতে হয়। এর জন্য অন্তত তিন মিনিট লাগার কথা, যে কারণে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়াটা অবিশ্বাস্য।
৬৯ পৌরসভায় ৮০ শতাংশের বেশি ভোট: পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভোট পড়েছে ৬৯টি পৌরসভায়। এসব পৌরসভার অধিকাংশই রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বগুড়ার কাহালুতে ৮৭ দশমিক ২৩, নন্দীগ্রামে ৮৮ দশমিক ৭৫, নওগাঁর কাকনহাটে ৮৯ দশমিক ৭৭, রাজশাহীর ভবানীগঞ্জে ৮৭ দশমিক ৫২, নাটোরের বড়াইগ্রামে ৮৮ দশমিক ১৭, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে ৮৭ দশমিক ৬০ ও যশোরের বাঘারপাড়ায় ৮৯ দশমিক ৭০ ভোট পড়ে। এর মধ্যে নন্দীগ্রামে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া বাকিগুলোতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরাই জিতেছেন।
রাঙামাটি পৌরসভা নির্বাচনে কারচুপি ও প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে জনসংহতি সমিতি আগামী রোববার ওই জেলায় সকাল-সন্ধ্যা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন ওই সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচনে ১১টি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা কেন্দ্র দখল ও ভোট জালিয়াতি করে ইচ্ছামাফিক ফল ঘোষণা করেছেন। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার পাল্টা অভিযোগ করেছেন, জনসংহতি সমিতির প্রভাবিত কেন্দ্রগুলোতেই ৯০ শতাংশ ভোট পড়েছে।
কমিশন সচিবালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মাত্র দুটি পৌরসভা ছাড়া বাকি সবগুলোতে ৬০ শতাংশের ওপরে ভোট পড়েছে। সাভার পৌরসভায় সর্বনিম্ন ৪৬ দশমিক ৯২ এবং মৌলভীবাজারে ৫৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। দুটিতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী জিতেছেন। ১০টি পৌরসভায় ভোট পড়েছে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশের মধ্যে। দিনাজপুর পৌরসভায় মেয়র পদে ভোট পড়েছে প্রায় ৬১ শতাংশ, সেখানে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
ভোটের ব্যবধান অস্বাভাবিক: বেশির ভাগ পৌরসভায় জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোটের ব্যবধান অস্বাভাবিক। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেয়েছেন ২০ হাজার ৬৯০ ভোট, বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন ৪৬৪ ভোট। বাঁশখালীতে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ১৩ হাজার ৩৩০, বিএনপি ৬ হাজার ৩৫০ ভোট। লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ১৯ হাজার ৬৫৭ ভোট, বিএনপি পেয়েছে ২ হাজার ৩০৯ ভোট। কুমিল্লার চান্দিনায় আওয়ামী লীগ পেয়েছে ১৮ হাজার ৯৭৭, বিএনপি পেয়েছে ২ হাজার ৩৫৭ ভোট। চাঁদপুরের কচুয়ায় আওয়ামী লীগ পেয়েছে ১০ হাজার ৭৩৪ এবং বিএনপি পেয়েছে ১ হাজার ৪৭৫ ভোট। কালাই পৌরসভায় আওয়ামী লীগ পেয়েছে ৬ হাজার ৭৫২ ভোট এবং বিএনপি পেয়েছে ২ হাজার ৩৬০ ভোট। উজিরপুরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেয়েছেন ৬ হাজার ৩০১ ভোট এবং বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন ২ হাজার ৩৬০ ভোট।
প্রথম আলোর প্রতিনিধিদের তথ্য: প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা ৫৪টি পৌরসভার বিভিন্ন কেন্দ্রে হামলা, ভোট বর্জন, কেন্দ্র দখল ও সাংবাদিক লাঞ্ছিত করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের খবর পাঠিয়েছেন। এতে দেখা যায়, ৩১টি পৌরসভার বিভিন্ন কেন্দ্রে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটের ঘটনা ঘটেছে ৩০টি পৌরসভায়। ১১টি পৌরসভার কিছু কেন্দ্রে সাংবাদিক লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মত: নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ব্রতী ২৪টি পৌরসভার ২৪০টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ১৫টিতে সহিংসতার তথ্য পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২৬টি কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্ট ছিলেন না।
ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ বলছে, এবারের পৌরসভা নির্বাচনে বেশ কিছু অনিয়ম ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তবে তা পুরো নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেনি। ১১১টি পৌরসভার নির্বাচন পর্যবেক্ষণের তথ্য জানিয়ে ওই গ্রুপ বলছে, নির্বাচনে বেশ কিছু কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে। আবার অনেক কেন্দ্রে ভালো নির্বাচনও হয়েছে। তবে সহিংসতার ঘটনাগুলো সার্বিক নির্বাচনের চেহারা পাল্টে দেয়নি।
২৮টি সংগঠনের ওই মোর্চা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ৬৩টি এবং বাইরে ১০৩টি সহিংসতার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছে। পর্যবেক্ষণ এলাকায় ভোটের শুরুতে ১২ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে বিএনপির কোনো এজেন্ট ছিলেন না।
১৪ দলের শরিকেরা হতাশ: ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলসহ কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশ নিলেও একটিতেও জয় পায়নি। জাসদ কুষ্টিয়া ও আলমডাঙ্গার দুটি পৌরসভায় জয় পাওয়ার আশা করেছিল। নড়াইল ও দিনাজপুরের দুটি পৌরসভায় জাসদের প্রার্থী প্রতিযোগিতা করবেন, এমন আশাও করেছিল দলটি। কিন্তু কোথাও প্রতিযোগিতা হয়নি।
জানতে চাইলে জাসদের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা বড় কিছু ছিল না। প্রথমত, আমরা চেয়েছিলাম দলের ভোটের শতকরা হার যাচাই করে দেখতে। কিন্তু কেন্দ্র দখল হলে সেই সুযোগ আর থাকে না। তা ছাড়া অনেক জায়গায় সত্যিকার ভোট হয়নি।’
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২০টি দল এবারের পৌর নির্বাচনে অংশ নেয়। এর মধ্যে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ সব কটিতে, বিএনপি ২২৩টি, জাতীয় পার্টি ৭৪টি, জাসদ ২১টি, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ ৫৭টি এবং ওয়ার্কার্স পার্টি ৮টি পৌরসভায় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। জাতীয় পার্টি একটি পৌরসভায় জয়ী হয়েছে।
ভোট হয়েছে ২৩৪টি পৌরসভায়। সাতটিতে মেয়ররা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। মেয়র পদে ভোট হয়েছে ২২৭টিতে। এর মধ্যে ২০৭টির বেসরকারি ফল প্রকাশ করা হয়েছে। বাকি ২০টি পৌরসভার ভোট গ্রহণ স্থগিত আছে।
নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাতটিসহ মোট ১৬৮টিতে জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া বিএনপি ১৯, জাতীয় পার্টি ১ ও স্বতন্ত্ররা ২৬টি পৌরসভায় জয় পেয়েছেন। তবে এই ২৬টির মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এবং জামায়াত-সমর্থক প্রার্থী আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *