Thu. Apr 3rd, 2025
Logo Signature
Agrani Bank
Rupali Bank
Advertisements

69খোলা বাজার২৪ : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০১৫

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস নেন না বলে অভিযোগ পাওয়াগেছে। দুই থেকে তিনটি ক্লাস নিয়েই কোর্স শেষ করে দিচ্ছেন শিক্ষকদের একাংশ। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব শিক্ষকদের অনেকেই বছরে অধিকাংশ সময় ক্লাস না নিয়ে পরীক্ষার আগ মূহুর্তে দু’ই তিনটা ক্লাস নিয়েই কোর্স শেষ করে দেন। এতে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্ছিত হচ্ছেন। সঠিক সময়ে কোর্স সম্পন্ন না হওয়ায় পরীক্ষাও হচ্ছে দেরিতে। ফলে ৪ বছরের স্নাতক এবং ১ বছরের স্নাতকোত্তর কোর্স শেষ করতে সাত থেকে আট বছর লেগে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, নিয়মানুযায়ী একটি কোর্সে কমপক্ষে ৩০ টি ক্লাস হতে হবে। কোনো কোনো অনুষদ ভেদে কমপক্ষে ৪৫ ক্লাস হতে হবে। জানা গেছে, এ নিয়মের তোয়াক্কা করছেন না শিক্ষকরা। বিশেষ করে বিভাগের সিনিয়র শিক্ষকদের ক্লাস না নেওয়ার প্রবণতা বেশি বলে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। এছাড়া যেসব শিক্ষক প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন তারা ঠিকমতো ক্লাস নেন না বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ১০৫ নং কোর্সের ক্লাস হয়েছে মাত্র একটি। শিক্ষার্থীরা জানান, বিভাগীয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. ত ম লোকমান হাকিম পনের মিনিটের ওই ক্লাসে শিক্ষার্থীদেরকে শুধু সাজেশন দিয়েই ক্লাস শেষ করেন।

ওই বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষক অধ্যাপক ড. রুহুল কে এম সালেহ ১০৭ নং কোর্সের মাত্র দুইটি ক্লাস নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, অনার্সের চার ইয়ারের প্রত্যেকটিতেই বিভাগীয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. রেজওয়ানুল ইসলামের কোর্স ছিল। শিক্ষার্থীরা জানান, তিনি চার বছরে মাত্র তিন থেকে চারটি ক্লাস নিয়েছেন। ইংরেজি বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ৪০৩ নং কোর্সের দায়িত্বে ছিলেন বিভাগীয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. দিলশাদ সুরমা। ওই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা জানান, তিনি ৪০৩ নং কোর্সের একটি ক্লাসও নেননি। পরীক্ষার আগে অন্য শিক্ষক একদিন ক্লাস নিয়ে কোর্স শেষ করে দিয়েছেন। জানা গেছে, ধর্মতত্ত্ব অনুষদভুক্ত আল কোরআন, আল হাদিস ও দাওয়াহ বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে ক্লাস না নেওয়ার প্রবণতা বেশি। এসব বিভাগের শিক্ষকরা মাদরাসা সংক্রান্ত কাজে বেশি সময় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঠিকমতো ক্লাস না নিলেও তারা ঠিকই মাদরাসা সংক্রান্ত কাজে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়মিত যাতায়াত করেন। আল হাদিস বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের বর্তমানে পরীক্ষা চলছে। ওই শিক্ষাবর্ষের ১২৬ নং কোর্সের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর। আল হাদিস বিভাগের ছাত্র সালেহ ফুয়াদ বলেন, ‘বিভাগীয় আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যারের প্রতি ভাল লাগা থেকেই মূলত আমি আল হাদিস বিভাগে ভর্তি হয়েছি। অথচ দেড় বছরেও তিনি তার কোর্সের একটি ক্লাসও নেননি।’

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ শেয়ার বাজার, ল্যান্ড বিজনেস সংক্রান্ত কাজে বেশি সময় দেন এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে নিয়মিত ঢাকায় গমন করেন। এসব শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস না নিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সান্ধ্যকালীন কোর্স ও প্রাইভট বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিকই নিয়মিত ক্লাস নেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষকরা খোঁড়া ওজুহাতে মাসের পর মাস ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত থাকা এবং ক্লাস না নিলেও তাদেরকে জবাবদিহি করতে হয় না। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো মনিটরিং করা হয় না। শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সময় সকাল আটটা থেকে চলে দুপুর দুইটা পর্যন্ত। এই হিসেবে, সকাল সাড়ে আটটা থেকে ক্লাস নেওয়ার কথা শিক্ষকরা দশটার দিকে কাম্পাসে আসেন। দুই ঘন্টা ক্যাম্পাসে অবস্থান করে আবার তারা বারটার বাসে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।

শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস না নেওয়ায় প্রকৃত শিক্ষা থেকে চরমভাবে বঞ্ছিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। নাম না প্রকাশ করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, স্যাররা বছরে একটি ক্লাসও নেন না। পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হলেই কেবলই কেবল তারা ক্লাস নেয়া শুরু করেন। বেশিরভাগ শিক্ষকই ৭ থেকে ১০ টি ক্লাস নিয়ে এক মাসের মধ্যে কোর্স শেষ করে দেন। আসলে ভার্র্সিটি পর্যায়ে এটাকে শিক্ষা বলে না, ফাঁকিবাজি।’

ক্লাস নেন না যেসব শিক্ষকরা: সম্প্রতি এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, আল কোরআন বিভাগের অধ্যাপক ড. হিজবুল্লাহ, অধ্যাপক ড. এরশাদুল্লাহ, অধ্যাপক ড. তাহির আহম্মেদ, আল হাদিস বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন, অধ্যাপক ময়নুল হক, অধ্যাপক ড. আবু তোরাব মোহাম্মাদ কেরামত আলী, অধ্যাপক ড. আশরাফুল আলম, দাওয়াহ বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল করিম, অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামাল, অধ্যাপক ড. আবু জাফর খান, অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী, ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক ড. আছাদুল্লাহ আল হুসাইন, অধ্যাপক ড. আজগার আলী, আফরোজা বেগম সাথী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ত ম লোকমান হাকিম, অধ্যাপক ড. রুহুল কে এম সালেহ, আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দা সিদ্দিকী, রাষ্ট্রনীতি ও লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাসিম বানু, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আ ও ম আছাদুজ্জামান, সহযোগী অধ্যাপক সুজিত কুমার মন্ডল, সহকারী অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ঠিকমতো ক্লাস নেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল হাকিম সরকার বলেন, ‘এ বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব মূলত বিভাগীয় সভাপতির। বিভাগীয় সভাপতির মাধ্যমে অনুষদীয় ডিন বিষয়টি মনিটরিং করতে পারে। তবে যেসব শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস নেননা তাদের বিরুদ্ধে যদি সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও অনুষদীয় ডিনদের পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হয় তাহলে প্রশাসনিকভাবে এসব শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’