Fri. Apr 4th, 2025
Logo Signature
Agrani Bank
Rupali Bank
Advertisements

খােলাবাজার২৪, সোমবার, ০৩মে, ২০২১ঃ গত ২৬ এপ্রিল গুলশানের একটি ফ্ল্যাটে মারা গেছেন মুনিয়া। মুনিয়ার পোস্টমর্টেম করা হয়েছে কিন্তু মুনিয়া মাদকাসক্ত ছিলেন কি-না এ সংক্রান্ত কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। এ ব্যাপারে অপরাধ বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মুনিয়ার আত্মহত্যার প্রবণতা নিরূপণের জন্য তার মাদকাসক্তি পরীক্ষাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলালউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশে তিনটি প্রধান কারণে মানুষ আত্মহত্যা করে। এর একটি কারণ হলো ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা। দুই, ব্যক্তিত্বের সমস্যা বা মানসিকতা এবং তিন, মাদকাসক্তি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সের নারীরা বেশি আত্মহত্যা প্রবণ হয় এবং এর একাধিক কারণ রয়েছে। এছাড়া তিনি বলেন, মানুষের বিষণ্নতা থেকে মাদকাসক্তির ওপর নির্ভরতা হয় এবং অ্যালকোহল, ইয়াবা ইত্যাদি আসক্তি তাকে একসময় মৃত্যুর দিকে উদ্বুদ্ধ করে। আর এই বক্তব্যকে সামনে নিয়ে আমরা যদি মুনিয়ার ঘটনাটি বিশ্লেষণ করি তাহলে আমরা দেখব, মুনিয়ার মধ্যে বিষণœতা হয়েছিল, ব্যক্তিত্বের সমস্যা হয়েছিল, সে কারণে তিনি মাদকাসক্ত হয়েছিলেন কি-না সেটি অবশ্যই তদন্তের বিষয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আত্মহত্যার আগে যদি তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন তাহলে এ ধরনের আত্মহত্যা করা খুবই সহজ। আর যদি তিনি মাদকাসক্ত হয়ে আত্মহত্যা করেন তার ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্ররোচনা কোনোভাবেই প্রযোজ্য হবে না। এ কারণেই অপরাধ বিজ্ঞানীরা এবং মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মুনিয়ার বিষয়টি আরও সংবেদনশীলভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। দেখা দরকার যে, কোন পরিস্থিতিতে কখন থেকে তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন।

এদিকে বিভিন্ন সূত্রের মতে, পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং মুনিয়া সম্পর্কে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে, মুনিয়ার মাদকাসক্ত থাকার সম্ভবনা প্রবল। কারণ যেসব নাচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে, একজন সুস্থ তরুণীর পক্ষে এটি করা অসম্ভব। কাজেই তিনি যে অসংলগ্ন ছিলেন সেটি বলাইবাহুল্য। কেউ কেউ মনে করেন, তাকে তার বোন নুসরাত যেভাবে ব্যবহার করেছে, এ কারণে তার মধ্যে ব্যক্তিত্বের সমস্যা তৈরি হয়েছিল এবং এই ব্যক্তিত্বের সমস্যা থেকে তার মধ্যে এক ধরনের বিষণ্নতাও তৈরি হয়েছিল। এই বিষণœতা থেকে তিনি হয়তো মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে মাদকাসক্তির পরিমাণ বেশি ছিল, যার কারণে হয়তো আত্মহত্যার পথে অনুপ্রাণিত হন তিনি।

কিন্তু এগুলো সবই ধারণা মাত্র। আর এই ধারণাকে সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ মাদকাসক্তি পরীক্ষা। পৃথিবীতে এ রকম বহু ঘটনা আছে, যে রহস্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে পুনঃপরীক্ষা এবং পুনঃময়নাতদন্ত করা হয়েছে। কাজেই মুনিয়ার মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, তাকে কি কেউ হত্যা করেছে, না তিনি নিজেই আত্মহত্যা করেছেন, আত্মহত্যা করলে তিনি কারও দ্বারা প্ররোচিত হয়ে করেছেন কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তরের একটি সঠিক সমাধান যেমন দরকার, তেমনি প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে নিরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণ করা দরকার। আর এ কারণেই মুনিয়া মাদকাসক্ত ছিলেন কি না, মাদক সেবন করতেন কি না, সেটিও পরীক্ষা করা খুব জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে মুুনিয়ার আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলা তদন্ত করতে গিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছে। বিশেষ করে মুনিয়ার জীবনযাপন, নুসরাতের সঙ্গে মুনিয়ার সম্পর্ক এবং মুুনিয়ার অতীত নিয়ে যে তথ্যগুলো পাচ্ছে তাতে এটি আর আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলা থাকছে না। মামলাটি নাটকীয়ভাবে অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে।

একাধিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মতে, মুনিয়ার মৃত্যুকে যেভাবে অপপ্রচার মামলা হিসেবে দায়ের করার চেষ্টা করা হয়েছিল ব্যাপারটা তত সহজ সরল নয়। দেখা যাচ্ছে, এর পেছনে এক ধরনের ব্ল্যাকমেইলিং রয়েছে এবং অতীতেও এ ধরনের বিভিন্ন তৎপরতার সঙ্গে এই দুই বোন জড়িত ছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেছেন, তারা নুসরাতকে ডেকেছেন এবং তাদের অতীত বিষয়গুলো জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। কিন্তু নুসরাত মিডিয়ার মাধ্যমে এই বিষয়গুলো নিয়ে একটি সহানুভূতি আনার চেষ্টা করছেন।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা বলছেন, আইন নির্মোহ, তদন্তে যা সত্য তাই বেরিয়ে আসবে। তদন্তে দেখা যাচ্ছে, যাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলায় বসুন্ধরার এমডি, তিনি নুসরাত এবং মুনিয়ার অনেকদিনের টার্গেট ছিল। তারা চেয়েছিল, বসুন্ধরার এমডিকে ব্ল্যাকমেইলিং করে অর্থ আদায় করা। কিন্তু মুনিয়ার যখন আকস্মিক মৃত্যু হয় তখন নুসরাত মনে করে, মুনিয়ার আত্মহত্যা মামলায় যদি বসুন্ধরার এমডিকে ফাঁসিয়ে দেওয়া যায় তাহলে একবারে বিত্তবান হওয়া যাবে। আর সে টার্গেট নিয়েই এই মামলাটি করা হয়েছে। কারণ প্রাথমিকভাবে কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই অপমৃত্যুর এই মামলাটি দায়ের করেছেন নুসরাত।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অডিও টেপের ওপর ভিত্তি করে বাজারে গুজব ছড়ানো হয়েছে যে, বসুন্ধরার এমডি আনভির ওই মেয়েটিকে হুমকি দিয়েছিল। সেই অডিও টেপটি দেড় বছরের পুরোনো। দেড় বছরের একটি পুরোনো টেপ কীভাবে সাম্প্রতিক সময়ের আত্মহত্যা প্ররোচনায় বর্তমান উপযুক্ত হতে পারে সেটি একটি বড় বিষয়। এছাড়াও যে ঘটনা সাজানো হয়েছিল একটি বাসায় ইফতারে যাওয়ার কারণে আনভীর তাকে বকে ছিল, সেটিরও কোনো বাস্তব সত্যতা পাওয়া যায়নি। এমনকি বসুন্ধরার এমডির অতীত নিয়ে যেসব কথাবার্তা বলা হয়েছিল, বসুন্ধরার এমডির মা তাকে হুমকি দিয়েছে ইত্যাদি এসবেরও বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সূত্রগুলো জানিয়েছে।

দেখা যাচ্ছে, নুসরাত এবং মুনিয়া অতীতে বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে ব্ল্যাকমেইল করেছেন, মুনিয়াকে দিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা এবং সেই সখ্যর পরে ওই ব্যবসায়ীকে ব্ল্যাকমেইল করাই ছিল নুসরাত-মুনিয়া জুটির প্রধান পেশা।

প্রথমে মুনিয়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঘনিষ্ট হতে তার একটা নিষ্পাপ চেহারা এবং গ্রামীণ সজীবতায় অনেকেই পটে যেতেন এবং তার সঙ্গে এক ধরনের সম্পর্ক করতেন। তারপর নুসরাত সামনে আসতেন এবং ওই ব্যবসায়ীকে ব্ল্যাকমেইল করতেন। মুনিয়া বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে চ্যাটিং করতেন ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে, তাদের কল রেকর্ড করতেন এবং অন্যান্য অসতর্ক মুহূর্তগুলো রেকর্ড করে নুসরাতের কাছে দিতেন এবং নুসরাত পরে এটিকে ব্যবহার করতেন।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা বলছেন, মুনিয়া যে একাধিক ব্যক্তির কথা রেকর্ড করেছে, এটি বাংলাদেশের টেলিগ্রাফ আইন অনুযায়ী দ-নীয় অপরাধ। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া একজন ব্যক্তি আরেকজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার কথোপকথন রেকর্ড করতে পারে না। এটি টেলিফোন-টেলিগ্রাফ অ্যাক্ট অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু মুনিয়া এবং নুসরাত এই কাজটিই করতেন ও ব্যবসায়ীদের ফাঁদে ফেলে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করাই ছিল তাদের মূল ব্যবসা। কিন্তু বসুন্ধরার এমডির ক্ষেত্রে সেটি সফল না হওয়ায় নুসরাতের আক্রোশ বেড়ে যায় এবং মুনিয়ার মৃত্যুর পর এক ধাক্কায় সবকিছু অর্জনের জন্যই এ মামলাটি করেছে বলে মনে করছেন অনেকে।