Fri. Apr 4th, 2025
Logo Signature
Agrani Bank
Rupali Bank
Advertisements

monroe_top1439731993মেরিলিন মনরো। হলিউডের প্রথম সেক্স সিম্বল। অভিনয় করেছেন ৩০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে হঠাৎ করেই মারা যান তিনি। তখন তার ক্যারিয়ারের অত্যন্ত ঘটনাবহুল সময়। যে সিনেমাটিতে কাজ করছিলেন, তাতেও চমক ছিল। সিনেমাটির শুটিং নিয়েও কম নাটক হয়নি।

সিনেমাটির শুরু
গত শতকের তিরিশ-চল্লিশের দশকে হলিউডে চলছিল স্ক্রুবল কমেডির দাপট। এই জনরার   সিনেমাগুলোতে একজন নারী চরিত্র থাকত, যে কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রের উপরও প্রাধান্য বিস্তার করত। এই প্রাধান্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চরিত্র দুটি কৌতুককর এক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হত। ব্রিটিশ রাজকবি আলফ্রেড, লর্ড টেনিসনের ইনোচ আর্ডেন (১৮৬৪) নামের বিখ্যাত এক কবিতা অবলম্বনে, ১৯৪০ সালে হলিউডে এ জনরার একটি সিনেমা বানানো হয়— মাই ফেভারিট ওয়াইফ। ষাটের দশকের শুরুতেই টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরি ফক্স সিদ্ধান্ত নেয়, তারা এই সিনেমাটি রিমেক করবে। নাম ঠিক করা হয় সামথিং’স গট টু গিভ। পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় জর্জ কিউকর-কে। প্রযোজক হেনরি ওয়েইনস্টাইন। চিত্রনাট্য নতুন করে সাজানোর কাজে লাগেন ওয়াল্টার বার্নস্টাইন আর নুনালি জনসন।

অভিনয় করবেন মেরিলিন মনরো
তখন মেরিলিন মনরো প্রায় বছরখানেক ধরে পর্দার আড়ালে। তার শেষ সিনেমা দ্য মিসফিটস-এর (১৯৬১) কাহিনি ও চিত্রনাট্য লিখেছিলেন তার তৃতীয় স্বামী আর্থার মিলার। সে বছরই মিলারের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তখন তার শরীরও খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। দুটো বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল। ওজন কমে গিয়েছিল প্রায় ২৫ কেজি। তবে ১৯৬২ সালেই তিনি আবার আলোচনায় ফিরে আসেন। গোল্ডেন গ্লোবে অ্যাওয়ার্ড জিতে। আর তারপরই সিনেমাটিতে কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন।

সিনেমাটিতে মেরিলিন মনরো এলেন আর্ডেন চরিত্রে অভিনয় করেন। তার বিপরীতের দুটি চরিত্রে কারা অভিনয় করবেন, সেটিও তিনি পছন্দ করে দেন। ডিন মার্টিন এবং ওয়ালি কক্স।

ইতিমধ্যেই মনরোর সঙ্গে তার তৃতীয় স্বামী আর্থার মিলারের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। নতুন করে ঘনিষ্ঠতা হতে থাকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির সঙ্গে। এমনকি সিনেমার শুটিং শুরুর আগেই, মনরো কেনেডির জন্মদিনে (১৯ মে) ছুটি নিয়ে রাখেন। হোয়াইট হাউস থেকে নাকি তলব করা আছে।

শুটিং শুরু, কিন্তু…
২৩ এপ্রিল শুটিং শুরু হলো। কিন্তু প্রথম দিনই শুটিংয়ে এলেন না মনরো। ওয়েইনস্টাইনকে ফোন করে জানালেন, সাইনাস ইনফেকশন। ইউনিটের ডাক্তারকে পাঠানো হলো। ডাক্তার জানালেন, মাসখানেক লাগবে। পরিচালক শুটিং শিডিউল খানিকটা বদলে নিলেন। কেবল মনরো ছাড়া সিকোয়েন্সগুলো শুট করতে লাগলেন। পরেও মনরো প্রায়ই অনুপস্থিত থাকতেন। কারণ— অসুস্থতা। কোনোদিন জ্বর, কোনোদিন মাথাব্যথা, কোনোদিন সাইনোসাইটিস আবার কোনোদিন ব্রঙ্কাইটিস। এভাবে শুটিং চলল দুই মাস।

এরমধ্যে জন এফ কেনেডির জন্মদিন চলে আসল। তখনও মনরো ভীষণ অসুস্থ। অনুষ্ঠান হবে নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে। ইউনিটের সবাই ভেবেছিল, মনরো সেখানে যেতেই পারবেন না। কিন্তু মনরো ঠিকই উপস্থিত হলেন। শুধু তাই না, প্রায় বিবস্ত্র হয়ে তার অসম্ভব আবেদনময়ী কণ্ঠে হ্যাপি বার্থডে টু ইউ গেয়ে মিস্টার প্রেসিডেন্টকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন।

হলিউডের মূল ধারার প্রথম নগ্ন দৃশ্য
নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরে এসে, সিনেমাটির জন্য মনরো ভীষণ এক পাবলিসিটি স্টান্ট করে বসলেন। একটা সিকোয়েন্স ছিল এরকম— এলেন (মনরো) পুলে সাঁতার কাটতে কাটতে নিককে (ডিন মার্টিন) ডাকে, পুলে নামার জন্য। নিক উল্টো এলেনকে পুল থেকে উঠে আসতে বলে। তখন নিক খেয়াল করে, এলেন বিবস্ত্র অবস্থায় সাঁতার কাটছে।

দৃশ্যটিতে অভিনয় করতে মনরোর জন্য একটা বডি স্টকিং বানানো হয়েছিল, গায়ের রঙের। কিন্তু মনরো সেই স্টকিং ছাড়াই, কেবল অন্তর্বাসের নিচের অংশ পরেই দৃশ্যটাতে অভিনয় করেন। দৃশ্যধারণ শেষে চিত্রসাংবাদিকদেরও ডেকে নেয়া হয়। চিত্রসাংবাদিকরা সেভাবে তো বটেই, পরে ওই অন্তর্বাসটুকু ছাড়াও তার ছবি তোলার সুযোগ পান। তখন অবশ্য মনরোর সাথে একটা তোয়ালে ছিল।

শেষবারের মতো সিনেমার সেটে
১ জুন ১৯৬২। মেরিলিন মনরোর ৩৬তম জন্মদিন। সিনেমার সেটে মনরোর জন্মদিন উদযাপনের সব আয়োজন প্রস্তুত ছিল সকাল থেকেই। কিন্তু জর্জ কিউকর দিনের শুটিং শেষ না করে উদযাপন করতে দিলেন না। মনরো আবার কবে অসুস্থ হয়, কে জানে! সেদিন সাত পাউন্ডের একটা কেক আনা হয়েছিল। গায়ে শুধু তোয়ালে জড়ানো মনরোর সেই বিখ্যাত ছবিটা দিয়ে ইউনিটের ইলাস্ট্রেটর একটা কার্টুনও এঁকেছিল।

জুনের ৪ তারিখেই আবারও সেটে অনুপস্থিত মনরো। ওয়েনস্টাইনকে ফোন দিয়ে বললেন, সাইনোসাইটিস। ততদিনে পরিচালক যারপরনাই বিরক্ত। একটা হেস্ত-নেস্ত করতে চান। ৮ তারিখ স্টুডিওর পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হলো, সিনেমা থেকে বাদ পড়েছেন মেরিলিন মনরো। কারণ, অপেশাদার আচরণ ও অধিক মাদক গ্রহণ। টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরি ফক্স তার নামে চুক্তিভঙ্গের মামলাও ঠুকে দিল। সাড়ে সাত লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে।

১৯৯০ সালে অবশ্য ওয়েনস্টাইন অন্য তথ্য জানান। সিনেমাটির শুটিং করতে গিয়ে মনরোর মাদক গ্রহণ বিষয়ক তেমন কোনো জটিলতাই নাকি হয়নি। আসলে অনিয়ম বা মাদক নয়, তাকে বাদ দেয়ার কারণ ছিল অর্থমন্দা। তখন নাকি ফক্সের ব্যবসায়ে বেশ মন্দা চলছিল। একে তাদের টেলিভিশন জমছিল না। তার উপর বিগ-বাজেট সিনেমা ক্লিওপেট্রা বানাতে গিয়ে বাজেটের চেয়েও খরচ হচ্ছিল বেশি।

ফের মনরোর সাথে চুক্তি
এই অবসরে মনরো লাইফ,কসমোপলিটন,ভোগ— তিন গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেন। ভোগে সেবারই প্রথম। এদিকে ফক্স মনরোকে বাদ দিয়ে লি রিমিক-কে চরিত্রটির জন্য বাছাই করে। কিন্তু ডিন মার্টিন সোজা বলে দেন, নো মেরিলিন, নো মার্টিন। শেষে নাকি ফক্স আবার মনরোকেই প্রস্তাব দেয়। মনরোর শর্ত অনুসারে বদলে ফেলা হয় পরিচালক। টাকাও বাড়ানো হয়। পাকা কথা হয় হোয়াট আ ওয়ে টু গো! নামের আরেকটি সিনেমার জন্যও।

শেষ হলো না শেষ সিনেমা
১৯৬২ সালের ৫ আগস্ট রাতে রহস্যজনকভাবে মারা যান মেরিলিন মনরো। তার সে মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে আজও। অনেকেই সন্দেহ করেন, ওষুধের ওভারডোজ নয়, বরং কোনো বিশেষ কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার মৃত্যুতে বন্ধ হয়ে যায় তার অভিনীত শেষ সিনেমাটির কাজও। ফক্স সিনেমাটি না বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। পরে, কাহিনিতে আরও ঘষামাজা করে, ১৯৬৩ সালে নতুন করে বানানো হয় মোভ ওভার, ডার্লিং নামে।

১৯৬৩ সালেরই এপ্রিলে একই প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে মুক্তি পায় মনরোকে নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি মেরিলিন। তাতে মনরো অভিনীত ফুটেজগুলোর কিছু অংশ ব্যবহৃত হয়। আর প্রায় সম্পূর্ণ ফুটেজই ব্যবহৃত হয় ১৯৯০ সালের ডকুমেন্টারি মেরিলিন: সামথিং’স গট টু গিভ-এ। পরে ১৯৯৯ সালের মেরিলিন মনরো : দ্য ফাইনাল ডেইস-এও ফুটেজগুলোর অংশবিশেষ ব্যবহৃত হয়।