খোলা বাজার২৪, শুক্রবার, ১ জানুয়ারি ২০১৬: ঘড়ির কাঁটায় যখন ১২টা, ঠিক তখনই রাজধানীতে নানা দিক থেকে একের পর এক পটকা ফোটার আওয়াজ আসছিল। তবে তা কারও জন্য আতঙ্ক নিয়ে আসেনি। কারণ এটা ছিল ২০১৬ সালকে বরণের আয়োজন।
২০১৫ সালের শুরুতে এই ধরনের শব্দ ছিল দেশবাসীর জন্য আতঙ্কের। ৫ জানুয়ারি শুরু হয়েছিল বিএনপি জোটের লাগাতার অবরোধ, আর তাতে বোমাবাজি, গাড়ি পোড়ানো চলছিল নির্বিচারে।
তিন মাসের নাশকতার পর সিটি ভোটের মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ আপাত শান্ত হলেও নিঃশব্দ ঘাতকের হাতে খুন হতে থাকেন একের পর এক লেখক-ব্লগার-প্রকাশক।
বছরের শেষ দিকে প্রথমে বিদেশি, এরপর শিয়া, আহমদিয়া সম্প্রদায় হয় আক্রান্ত, বিভিন্ন স্থানে হুমকি পেতে থাকেন যাজকরাও।
এভাবে যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে দেওয়ার আহ্বানই বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে পটকা ফোটার আওয়াজে পাচ্ছিলেন রাজধানীবাসী অনেকে।
নানা ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রগতি ছাপিয়ে এই নাশকতা, হামলা, খুনই হয়ে উঠেছিল ২০১৫ সালে বছরের আলোচিত বিষয়ে।
বছরের শুরুতে সংঘাতময় কর্মসূচিতে সরকারের পতন ঘটাতে ব্যর্থ বিএনপি বছরের শেষে পৌরসভা নির্বাচনে হারের পরও নির্বাচনকেই যখন আন্দোলনের পন্থা হিসেবে ঠিক করার ঘোষণা দেয়, তা এক ধরনের স্বস্তি হতে পারে দেশবাসীর জন্য।
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জঙ্গিবাদ দমনকেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নতুন বছর বরণে তাই মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আনন্দে মাতোয়ারা তরুণদের ভিড়ে থাকা মাসুম আহমেদ বলেন, “নতুন বছরে আমরা যেন নির্ভয়ে সব আনন্দ উদযাপন করতে পারি, মুক্ত চিন্তার প্রকাশে অন্ধকারের শক্তি যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটাই প্রত্যাশা।”
যেখানে এই বছর বরণের এই উৎসব চলছিল, গত ফেব্র“য়ারিতে সেখানেই খুন করা হয় লেখক অভিজিৎ রায়কে। এরপর কয়েক মাসের ব্যবধানে খুন হন ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত দাশ বিজয়, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়।
লেখকদের পর হামলার লক্ষ্যবস্তু হন প্রকাশকরা। জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনকে শাহবাগে তার কার্যালয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিনে হামলা হয় শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলের উপরও।
ঢাকা সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর এক সদস্যকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়; চট্টগ্রাম নৌঘাঁটিতে মসজিদে হয় বোমা হামলা।
এর মধ্যেই এক সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকায় ইতালীয় নাগরিক চেজারে তাভেল্লা এবং রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোসি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়।
মহররমে ঢাকায় হোসাইনী দালানে এবং বগুড়ায় মসজিদে আক্রান্ত হয় শিয়া সম্প্রদায়, রাজশাহীতে আহমদিয়া মসজিদে হয় বোমা হামলা। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি স্থানে আক্রান্ত হন খ্রিস্টান ধর্মযাজকরা।
এ ধরনের কয়েকটি হামলার পর কখনও আল কায়দার নামে কখনও বা আইএসের নামে দায় স্বীকারের বার্তা এলেও সরকারের পক্ষ থেকে তা নাকচ করা হয়।
বিদেশি নয়, বাংলাদেশি জঙ্গি এবং অপরাধীরা হামলা চালিয়ে আইএস ও আল কায়দার নাম ব্যবহার করছে বলে সরকার দাবি তোলার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়ে জেএমবির নানা আস্তানা।
নিষিদ্ধ এই সংগঠনটিকে দমনের দাবি মন্ত্রীরা এতদিন ধরে করে এলেও ভেতরে ভেতরে তাদের তৎপরতা চালানোর খবর স্পষ্ট হতে থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেই।
সূর্য যাচ্ছে অস্তাচলে, কক্সবাজার সৈকতের এই সূর্য ২০১৫ সালের শেষ দিনটির অবসানের ঘোষণা দিচ্ছে, ভোরে যখন এই সূর্য আবার উঠবে, তখন শুরু হবে ২০১৬ সাল। ছবি: নয়ন কুমার সূর্য যাচ্ছে অস্তাচলে, কক্সবাজার সৈকতের এই সূর্য ২০১৫ সালের শেষ দিনটির অবসানের ঘোষণা দিচ্ছে, ভোরে যখন এই সূর্য আবার উঠবে, তখন শুরু হবে ২০১৬ সাল।
বছরের একেবারে শেষে এসে চার দিনের ব্যবধানে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি বড় জঙ্গি আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও অস্ত্র পাওয়ার কথা জানায় গোয়েন্দা পুলিশ।
তবে জঙ্গিবাদী এই তৎপরতায় রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন হারানো জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরাই সম্পৃক্ত বলে সরকারের দাবি।
‘বিদেশি প্রেসক্রিপশন’ অনুযায়ী বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড চালানো হচ্ছে বলেও মন্ত্রীদের কথায় আসে। আর এর সপক্ষে পাকিস্তান দূতাবাসের দুই কর্মকর্তার জঙ্গি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলার কথাও জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব প্রমাণের একটি ষড়যন্ত্র চলছে।
তবে ষড়যন্ত্র যাই থাকুক,রাজধানীর আপাত শান্ত মাঠে জঙ্গিবাদী এই ধরনের হামলার অবসানই দেখতে চাইছেন দেশবাসী।
রাজধানীর কলাবাগানে দর্জির দোকানের কর্মী সাগর হোসেনের ভাষায়, “সামনের বছর আল্লাহ যেন ভালো রাখেন।”
আওয়ামী সরকার কেমন দেশ চালাচ্ছে-এই প্রশ্নে মোহাম্মদপুরের রঙমিস্ত্রি কুদ্দুস মোল্লার উত্তর, “শেখ হাসিনার সরকার ভালোভাবেই দেশ চালাচ্ছেন।”
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু, ভারতের সঙ্গে বহু প্রতীক্ষিত ছিটমহল বিনিময়, অর্থনীতির নানা সূচকে অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার স্বীকৃতি আওয়ামী লীগকে অনেক আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
সেই আত্মবিশ্বাসে ভর করে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশের চাপ উপেক্ষা করে এই বছরই তিন যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আলী আহসান মো. মুজাহিদ ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে এই সরকার।
আর সেই আত্মবিশ্বাসে ভর করেই শেখ হাসিনা বলেছেন,জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড বা নাশকতা সৃষ্টি করে তার সরকারকে টলানো যাবে না।
“ষড়যন্ত্র চলছে, সেই ষড়যন্ত্র ভেদ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। তাদের সেই বিষদাঁত একে একে ভেঙে দিচ্ছি, ভেঙে দেব।”
আরও পড়ুন
