Thu. Jun 4th, 2026


খােলাবাজার২৪,বুধবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৮ঃ  একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৩০ ডিসেম্বর। আগামী ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বর্তমান (দশম) সংসদের মেয়াদ রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ জন্য  ৮ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে ‘তফসিল’ ঘোষণা করেছে। এবার তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ভোটগ্রহণের দিন পর্যন্ত নির্বাচন সময় হচ্ছে ৪৫ দিন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪২ দিন সময় দিয়ে তফসিল ঘোষণা করেছিল বিগত কমিশন।

নভেম্বরের ১ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপ চালিয়েছেন সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে। ঐক্যফ্রন্টের দাবি ছিল নির্বাচনের আগে তাদের সাত দফা মেনে নেওয়া হোক। কিন্তু সংলাপের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি করা এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা সৃষ্টিকে নিরুৎসাহ করা। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও ঐক্যফ্রন্টের সাত দফার অনেকগুলো পূরণ করা সম্ভব নয় বলে এরই মধ্যে সবাই স্বচ্ছ ধারণা পেয়েছেন। এ জন্য একদিকে নির্বাচন, অন্যদিকে সংলাপের সাফল্য নিয়ে নানা বিতর্ক ও বিশ্লেষণ চলছে। সিইসি অবশ্য সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছে। রাজনৈতিক মতবিরোধ নিষ্পন্ন করতে রাজনৈতিক দলগুলোকেই অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে বা মতবিরোধ থেকে থাকলে রাজনৈতিকভাবে মীমাংসা করতে হবে। নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী ও ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন বাদ দিয়ে মোট ৩৯টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। এ ছাড়া স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে।

নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ভিডিপি, আনসার, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ড বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীকেও মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন সিইসি। ছয় লক্ষাধিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখা হবে। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নির্বাচনে মোট আট দিন সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকবে। নির্বাচনের আগের পাঁচ দিন, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনের পরে আরো দুই দিন। সেনা মোতায়েনে ঐক্যফ্রন্টের দাবি বলা চলে পূরণ হতে যাচ্ছে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের বাজেট ধরা হয়েছে ৭০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা ব্যয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা, আর আইন-শৃঙ্খলা খাতে ব্যয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এদিকে ইসির সর্বশেষ প্রকাশিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী মোট ভোটার ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন। এর মধ্যে পুরুষ পাঁচ কোটি ২৫ লাখ ৪৭ হাজার ৩২৯ জন এবং নারী পাঁচ কোটি ১৬ লাখ ৪৩ হাজার ১৫১ জন। ভোটকেন্দ্র ৪১ হাজার ১৯৯টি। ভোটকক্ষ দুই লাখ ছয় হাজার ৫৪০টি। এতে সাত লাখের বেশি ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হচ্ছে। অন্যবারের মতো এবারও নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে জেলা প্রশাসককে (ডিসি) নিয়োগ করা হয়েছে। আর সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে রয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে সার্চ কমিটির মাধ্যমে। অন্যদিকে নির্বাচন পরিচালনায় জেলা ও থানা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নকল্পে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে বর্তমান সরকার দক্ষ, সেবামুখী, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত জনপ্রশাসন গড়ে তুলেছে। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ছয় লাখ সাত হাজার ২৩১টি পদ সৃজনের অনুমোদন দেওয়া হয়। আটটি বিসিএস (২৮-৩৫তম) পরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যাডারে ২২ হাজার ১৭৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৩৬তম বিসিএসে উত্তীর্ণ বিভিন্ন ক্যাডারে দুই হাজার ২০২ জন নিয়োগ পেয়েছেন। তা ছাড়া ৩৬তম বিসিএস ও নন-ক্যাডার পদে ২৮৪ জনকে প্রথম শ্রেণি এবং ৯৮৫ জনকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পদায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩৭তম বিসিএস ও বিভিন্ন ক্যাডারে এক হাজার ৩১৪ জন প্রার্থী এরই মধ্যে সুপারিশকৃত, যাঁদের পদায়নের কার্যক্রম শেষ হয়েছে। আবার ৩৮তম বিসিএসের পরীক্ষা কার্যক্রম শেষ হয়ে ফলাফল ঘোষণার কাজ চলছে। নির্বাচন সামনে রেখে বলা চলে এখন প্রশাসনের কার্যক্রম আরো বেগবান এবং শিক্ষিত যুবসমাজের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে ব্যাপকভাবে। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পদে চার হাজার ৫২৩ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। প্রায় ২৫ হাজার সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটের সমন্বয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম জাতীয় তথ্য বাতায়ন নির্মিত হয়েছে, যা ২০১৫ সালে ডাব্লিউএসআইএস (ওয়ার্ল্ড সামিট অন দি ইনফরমেশন সোসাইটি) পুরস্কারে ভূষিত হয়। সরকারি সব সেবা এক ঠিকানায় পাওয়ার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ৪০০টি সেবা নিয়ে বন্ধু এবং এক হাজার ৪০০টির বেশি সরকারি ফরম নিয়ে ফর্মস পোর্টাল চালু আছে। ২০১৬ সালের ২৩ জুলাই প্রথমবারের মতো প্রশাসনে বিশেষ কাজের জন্য জনপ্রশাসন পদক প্রদান করা হয়, যা প্রতিবছর প্রদান করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার জনপ্রশাসনকে যোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে ঢেলে সাজিয়েছে এবং নির্বাচনে তারা নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করবে বলেই আমরা মনে করি।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার প্রভাব পড়েছে সর্বত্র। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে তথ্য ও সেবাকেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব তথ্যকেন্দ্র থেকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিভিন্ন সরকারি ফরম, নোটিশ, পাসপোর্ট ও ভিসাসংক্রান্ত তথ্য, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিভিন্ন সেবাবিষয়ক তথ্য, চাকরির খবর, নাগরিকত্ব সনদ, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল, বিদেশে চাকরি প্রাপ্তির লক্ষ্যে রেজিস্ট্রেশনসহ ২২০টি সেবা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। উপরন্তু মোবাইল ব্যাংকিং, জীবন বীমা, মাটি পরীক্ষা ও সারের সুপারিশ, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ এবং জমির পর্চাসহ অন্যান্য সেবা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। মোবাইল টেলিফোন সিমের সংখ্যা ১৫ কোটিতে উন্নীত হয়েছে আর থ্রিজির পর ফোরজি (২০১৮) প্রযুক্তি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে ব্যাপকভাবে। এভাবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। এ ছাড়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ জন্যই চীন-জাপান-ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানসহ বিশ্বের সব নেতা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করছেন। তাঁদের মতে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব অনিবার্য।

দেশের দুটি ধারার রাজনৈতিক বলয়ের একটির লক্ষ্য বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা। অন্যদিকে আরেকটি শক্তির অভিলাষ—যেকোনো মূল্যে ১৫ কিংবা ২১ আগস্টের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়া। এসব দুষ্কৃতকারী সব সময় দেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দিতে চেয়েছে। বিশেষত ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকে ১৯ বার শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে। মূলত হত্যার প্রচেষ্টা ও হুমকির মধ্যেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যেভাবে এগিয়েছে, তাতে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে—এটা নিশ্চিত। তাই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সব অশুভ শক্তির মোকাবেলা করতে হবে। সামনে বাধা এলে তা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলায় সচেষ্ট থাকতে হবে। একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে দেশের স্বাধীনতা ও স্বপ্নকে হত্যা করতে চেয়েছিল। শেখ হাসিনা জীবিত রয়েছেন। তিনিই তাঁর পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা বসে নেই; ষড়যন্ত্রকারীরা নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। তাই ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সবাইকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে; একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। কারণ আমরা বাঙালিরা পারি, আমরা নির্ভীক ও আমাদের গতি অদম্য।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক,

জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়